লোগো

মা-বাবার মানসিক চাপ: শিশুর আচরণে নীরব প্রভাব

মা-বাবার মানসিক চাপ: শিশুর আচরণে নীরব প্রভাব

শাহ আলম আগে বুঝতেই পারত না কেন তার তিন বছরের ছেলে রাফি হঠাৎ হঠাৎ খুব রেগে যায়। ছোট্ট একটা ব্যাপারেও কান্না শুরু করে, কখনো জিনিস ছুড়ে ফেলে, আবার কখনো চুপচাপ হয়ে বসে থাকে। প্রথমে সে ভাবত, “বাচ্চা মানুষ, আদর বেশি পেয়েছে তাই হয়তো এমন করছে।”

কিন্তু একদিন রাতে একটা ঘটনা তার মাথায় ঘুরতে থাকে। সেদিন সারাদিন কাজ কম ছিল। আয়ও খুব কম হয়েছে। বাসায় ফিরে টাকার চিন্তায় তার মাথা গরম ছিল। অন্যদিকে তার স্ত্রীও তখন চার মাসের গর্ভবতী। সারাদিন অন্যের বাসায় কাজ করে এসে ক্লান্ত শরীরে রান্না, ঘর গুছানো, সব মিলিয়ে সেও খুব চাপে ছিল।
রাফি খেলতে খেলতে পানি ফেলে দিলে শাহ আলম রেগে যায়। তার স্ত্রীও বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে ওঠে। এরপর পুরো সন্ধ্যা রাফিও খিটখিটে আচরণ করে, মায়ের কথা শোনে না, এমনকি রাতে ঠিকমতো ঘুমায়ও না।
তখন প্রথমবারের মতো শাহ আলম ভাবতে শুরু করেন, তাদের নিজেদের চাপ কি শুধু রাফির উপরই না, অনাগত সন্তানের উপরও প্রভাব ফেলছে?
বিজ্ঞান বলছে, হ্যাঁ। বাবা-মায়ের মানসিক চাপ শিশুর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে, আর গর্ভাবস্থায় মায়ের অতিরিক্ত চিন্তা অনাগত শিশুর উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট শিশুরা আশেপাশের আবেগ খুব দ্রুত “ধরে ফেলে”। বাবা-মা যদি সবসময় রাগান্বিত, উদ্বিগ্ন বা মানসিকভাবে ক্লান্ত থাকেন, তাহলে শিশুরাও অস্থির হয়ে যেতে পারে। এটাকে Emotional Contagion (ইমোশনাল কনটেজন) বলা হয়।
অর্থাৎ, বড়দের আবেগ ছোটদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে।
নিম্ন আয়ের পরিবারে এই চাপ আরও বেশি দেখা যায়। প্রতিদিনের আয় অনিশ্চিত, বাজারের খরচ বাড়ছে, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সব মিলিয়ে সংসারের টেনশন থামেই না।
শাহ আলমের স্ত্রী এখন প্রায়ই চিন্তা করে, “নতুন বাচ্চা আসলে খরচ কিভাবে চলবে?” এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ গর্ভবতী মায়ের শরীরেও প্রভাব ফেলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত চিন্তা থাকলে শরীরে “কর্টিসল” নামে এক ধরনের stress hormone (স্ট্রেস হরমোন) বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘসময় এই অবস্থা চললে তা অনাগত শিশুর বিকাশের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে—
•    গর্ভের শিশুর ঘুম ও নড়াচড়ার প্যার্টান প্রভাবিত হতে পারে 
•    জন্মের পর শিশু বেশি অস্থির বা খিটখিটে ভাব দেখাতে পারে 
•    ভবিষ্যতে অ্যাংজাইটি (Anxiety) বা ইমোশনাল রেগুলেশন (Emotional Regulation) এর সমস্যা বাড়তে পারে 
•    কিছু ক্ষেত্রে কম ওজন নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকিও বাড়তে পারে 
তবে এখানে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রেস হওয়া মানেই ক্ষতি হয়ে যাবে এমন না। গর্ভাবস্থায় হালকা দুশ্চিন্তা স্বাভাবিক। সমস্যা হয় যখন চাপ দীর্ঘসময় ধরে খুব তীব্রভাবে চলতে থাকে এবং মা একদমই মানসিক সমর্থন না পান।
শাহ আলম আগে ভাবতেন, টাকা দিলেই দায়িত্ব শেষ। এখন সে বুঝতে শুরু করেছে, স্ত্রীর মানসিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। এখন মাঝে মাঝে সে বাসায় ফিরে স্ত্রীর সাথে শান্তভাবে কথা বলে। রাফিকে নিয়ে কিছুক্ষণ বাইরে হাঁটতে যায় যাতে তার স্ত্রী একটু বিশ্রাম পায়। কখনো নিজেই বাজার থেকে পানি এনে দেয়। ছোট ছোট সাহায্য হলেও এতে তার স্ত্রীর মানসিক চাপ কিছুটা কমে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভবতী মায়েরা যদি পরিবারের কাছ থেকে ইমোশনাল সাপোর্ট পান, তাহলে তাদের মানসিক চাপ তুলনামূলক কম থাকে এবং সেটি মা ও শিশুর জন্য উপকারী হয়।
অন্যদিকে রাফির ক্ষেত্রেও শাহ আলম এখন বুঝেছেন, শিশুর “খারাপ আচরণ” অনেক সময় আসলে তার ভেতরের অস্থিরতার প্রকাশ। যখন বাসায় চিৎকার, ভয় বা টেনশনের পরিবেশ বেশি থাকে, তখন ছোট শিশুরা সেটা নিজের মতো করে আচরণের মাধ্যমে দেখাতে শুরু করে। তাই সন্তানের ভালো আচরণ চাইলে শুধু তাকে বকা দিলেই হয় না। পরিবারের পরিবেশটাও শান্ত ও নিরাপদ রাখা দরকার।
শাহ আলম এখনো সংগ্রাম করছেন। টাকার চিন্তাও শেষ হয়নি। কিন্তু সে ধীরে ধীরে বুঝছে পরিবারের মানসিক পরিবেশ শুধু আজকের দিনের উপর না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপরও প্রভাব ফেলে।
একটা শিশু জন্মের আগেই তার চারপাশের পৃথিবীর প্রভাব অনুভব করতে শুরু করে। তাই গর্ভবতী মায়ের পাশে থাকা, তাকে মানসিক স্বস্তি দেয়া আর পরিবারের ভেতরে একটু শান্ত পরিবেশ তৈরি করা; এগুলো শুধু ভালোবাসা না, সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যতেরও অংশ।
 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000