
যমজ ছেলে হওয়ার পর আমি একটা জিনিস খুব দ্রুত বুঝতে পারলাম, সন্তান লালন-পালন শুধু মা-বাবার বিষয় না, বিশেষ করে যৌথ পরিবারে। আমাদের বাসায় বাচ্চাদের নিয়ে সবার আলাদা মতামত আছে। কেউ বলে বেশি কোলে নিলে অভ্যাস খারাপ হবে, কেউ বলে শিশুকে কান্না করতে দেওয়া উচিত না। কেউ চায় পুরোনো নিয়ম মেনে চলতে, আবার আমরা অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করতে চাই।
শুরুতে আমি ভাবতাম, মতের অমিল মানেই হয়তো কেউ ভুল আর কেউ ঠিক। পরে বুঝলাম, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যার মূল কারণ হলো ভালোবাসা প্রকাশের ধরন ভিন্ন হওয়া।
যৌথ পরিবারে বড়রা সাধারণত নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দেন। তাঁদের সময় সন্তান লালন-পালনের ধরণ ছিল ভিন্ন। তখন এত গবেষণা, শিশু মনোবিজ্ঞান নিয়ে সচেতনতা বা বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক আলোচনা ছিল না। তাই তাঁদের অনেক পরামর্শ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে আমাদের প্রজন্ম চিকিৎসকের পরামর্শ, গবেষণা এবং আধুনিক দিকনির্দেশনা অনুসরণ করতে বেশি আগ্রহী।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থেকেই অনেক সময় মতবিরোধ শুরু হয়।
আমাদের বাসায় একটি সাধারণ বিষয় ছিল ঘুমের রুটিন নিয়ে। আমরা বাচ্চাদের নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আত্মীয়স্বজন এলে সবাই কোলে নিতে চাইত, খেলাতে চাইত। ফলে রুটিন ভেঙে যেত। প্রথমদিকে আমি বিরক্ত হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতাম। পরে বুঝলাম, রাগ বা প্রতিরক্ষামূলক ভঙ্গি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, মানুষ যখন মনে করে তাকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন সে নিজের অবস্থানে আরও অনড় হয়ে যেতে পারে। তাই সন্তান লালন-পালন নিয়ে মতবিরোধ সামলানোর প্রথম ধাপ হলো সম্মান বজায় রাখা।
এখন আমরা সরাসরি “এটা ভুল” বলি না। বরং বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করি। যেমনঃ
“চিকিৎসক বলেছেন, শিশুরা অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে গেলে তাদের ঘুমের সমস্যা হতে পারে।”
অথবা,
“আমরা একটু নিয়মিত রুটিন বজায় রাখার চেষ্টা করছি।”
এ ধরনের শান্ত ও সম্মানজনক যোগাযোগ অনেক বেশি কার্যকর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মা-বাবার নিজেদের মধ্যে একমত থাকা।
স্বামী-স্ত্রী যদি নিজেদের মধ্যেই দ্বিধায় থাকেন, তাহলে পারিবারিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে। আমি আর আমার স্ত্রী এখন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি। তারপর পরিবারের অন্যদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলি। এতে বিভ্রান্তি অনেক কম হয়।
তবে এটাও সত্যি, সব বিষয়ে তর্ক করার প্রয়োজন নেই।
কিছু বিষয় আছে যেগুলোতে নমনীয় হওয়া যায়। যেমনঃ কে কোলে নিল বা কোন কাপড় পরাল, এসব নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা না করাই ভালো। তবে শিশুর নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে স্পষ্ট সীমারেখা থাকা জরুরি। যেমনঃ
• অসুস্থ অবস্থায় শিশুকে কোলে নিতে না দেওয়া
• অনিরাপদভাবে খাওয়ানো এড়িয়ে চলা
• অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার না করা
• নিরাপদ ঘুমের নিয়ম মেনে চলা
এসব ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্দেশনা অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
যৌথ পরিবারে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনাকাঙ্ক্ষিত পরামর্শের চাপ।
নতুন বাবা-মা হিসেবে শুরুতে আমরা প্রায়ই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে যেতাম। সবাই কিছু না কিছু বলছে। পরে বুঝলাম, সব পরামর্শ অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। কারণ এক শিশুর জন্য যা ভালো কাজ করে, অন্য শিশুর জন্য তা নাও করতে পারে।
শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরাও বলেন, শিশুর ব্যক্তিগত প্রয়োজন বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভালো লালন-পালনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আরেকটি বিষয় আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, দাদা-দাদী, নানা-নানীদের পুরোপুরি দূরে সরিয়ে না রাখা।
অনেক আধুনিক বাবা-মা এমনভাবে সীমারেখা নির্ধারণ করেন যে বড়রা মানসিকভাবে কষ্ট পান। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের সকল সদস্যদের ইতিবাচক অংশগ্রহণ শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য উপকারী হতে পারে। তাই প্রয়োজন ভারসাম্য।
আমরা এখন চেষ্টা করি পরিবারের সবাইকে সম্পৃক্ত রাখতে, কিন্তু সন্তানের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শান্তভাবে নিজেরাই নিতে। যেমন, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর সঙ্গে বাচ্চাদের সময় কাটাতে দিই, তবে রুটিন বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দিই।
সবশেষে আমি একটা বিষয় বুঝেছি, যৌথ পরিবারে সন্তান লালন-পালন নিয়ে মতবিরোধ পুরোপুরি এড়ানো প্রায় অসম্ভব। কারণ এখানে শুধু শিশুকে বড় করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ, অভিজ্ঞতা, প্রজন্মগত পার্থক্য এবং ভালোবাসা।
তাই “কে জিতল” সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশুর কল্যাণ সবার আগে থাকে। কারণ শেষ পর্যন্ত, সবাই আসলে একই জিনিসই চায় যে শিশুটি যেন নিরাপদ, সুখী এবং সুস্থভাবে বড় হয়ে উঠতে পারে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন