
শাহ আলম প্রায়ই একটা ব্যাপার খেয়াল করে। সারাদিন রাস্তার পাশে বসে জুতা সেলাই করার পর যখন বাসায় ফেরে, তার তিন বছরের ছেলে রাফি মোবাইল দেখতে চায়। বাসার এক কোণে বসে থাকা ছেলেটার জন্য নতুন খেলনা কেনার সামর্থ্য সবসময় থাকে না। বাজারে চাল, ডাল, ওষুধ, এসবের দাম সামলাতেই মাস শেষ হয়ে যায়।
একদিন রাফির মা রান্নাঘরের খালি মসলার ডিব্বা আর কয়েকটা বোতলের ঢাকনা একসাথে রেখে কাজ করছিল। রাফি সেগুলো নিয়ে টুংটাং শব্দ করতে শুরু করে। কখনো রঙ আলাদা করছিল, কখনো বড়-ছোট মিলাচ্ছিল। শাহ আলম তখন প্রথম বুঝতে পারে, শিশুর শেখার জন্য দামি খেলনা সবসময় জরুরি না।
শিশু বিশেষজ্ঞ ও শিশু বিকাশ বিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, ছোট শিশুরা সবচেয়ে বেশি শেখে “খেলতে খেলতে”। বিশেষ করে ০–৫ বছরের শিশুদের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত নতুন সংযোগ তৈরি করে। এই সময় তারা স্পর্শ, শব্দ, রঙ, আকার আর নড়াচড়ার মাধ্যমে পৃথিবীকে বুঝতে শেখে। তাই বাসার সাধারণ জিনিস দিয়েও শিশুর সৃজনশীলতা ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটানো সম্ভব।
অনেক সময় অভিভাবকেরা ভাবেন, ভালো খেলনা মানেই দোকান থেকে কেনা প্লাস্টিকের খেলনা। কিন্তু বাস্তবে শিশুর কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয় এমন জিনিস, যেটা দিয়ে সে নিজে কিছু বানাতে পারে বা নতুনভাবে ব্যবহার করতে পারে।
যেমন ধরুন, খালি কার্টনের বাক্স। শাহ আলম একদিন পুরোনো জুতার বাক্স কেটে রাফির জন্য ছোট্ট একটা “বাস” বানিয়ে দেয়। সামনে গোল করে কাগজ লাগিয়ে হেডলাইট বানানো হয়। রাফি সেই বাক্সে বসে “ব্রুম ব্রুম” শব্দ করে খেলতে থাকে। এই ধরনের কল্পনাভিত্তিক খেলা শিশুর ভাষা শেখা, সামাজিক আচরণ আর কল্পনাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
আবার পুরোনো বোতলের ঢাকনা দিয়েও অনেক কিছু করা যায়। বিভিন্ন রঙের ঢাকনা আলাদা করতে বলা, বড়-ছোট সাজাতে বলা, এগুলো শিশুর সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও পর্যবেক্ষণ দক্ষতা বাড়ায়। শিশু তখন খেলতে খেলতেই রঙ, সংখ্যা আর তুলনা শেখে।
শাহ আলমের স্ত্রী মাঝে মাঝে পুরোনো কাপড় দিয়ে ছোট বল বানিয়ে দেয়। সেই বল ছুড়ে ধরা, গড়িয়ে দেয়া, এসব খেলায় শিশুর হাত-পায়ের সমন্বয় ভালো হয়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন মোটর স্কিল ডেভেলপমেন্ট। বিশেষ করে ছোট বয়সে দৌড়ানো, ধরা, ঠেলা, গড়া, এসব কাজ শিশুর মস্তিষ্ক ও শরীরের সংযোগ শক্তিশালী করে।
আরেকটা সহজ খেলা হতে পারে “শব্দ চিনো”। খালি প্লাস্টিক বোতলে চাল, ডাল বা ছোট পাথর ভরে ঝাঁকালে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ হয়। শিশু তখন শব্দ আলাদা করতে শেখে। এতে তার সেন্সরি ডেভেলপমেন্ট বা ইন্দ্রিয়গত বিকাশে সাহায্য হয়।
তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হচ্ছে নিরাপত্তা। ছোট শিশুদের খেলনার ক্ষেত্রে ধারালো জিনিস, খুব ছোট বস্তু বা সহজে খুলে যায় এমন কিছু ব্যবহার করা ঠিক না। কারণ শিশুরা অনেক সময় মুখে দিয়ে ফেলে। তাই খেলনা বানানোর সময় বড়দের নজর রাখা জরুরি।
শাহ আলম এখন বুঝে গেছে, সন্তানের ভালো শৈশব মানেই অনেক টাকা খরচ না। কখনো পুরোনো কৌটা দিয়ে ট্রেন, কখনো কাগজ দিয়ে ঘুড়ি, কখনো বালিশ দিয়ে ছোট দুর্গ, এসবই রাফির সবচেয়ে আনন্দের খেলনা হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বড় কথা, এসব খেলায় বাবা-মাও যখন অংশ নেয়, তখন শিশুর মানসিক নিরাপত্তা বাড়ে। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব শিশু ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সাথে খেলাধুলা ও কথাবার্তার সুযোগ পায়, তারা আত্মবিশ্বাসী ও সামাজিকভাবে বেশি স্বাভাবিক হয়।
অভাবের সংসারে সব ইচ্ছা পূরণ করা যায় না, কিন্তু সময়, মনোযোগ আর একটু সৃজনশীলতা দিয়ে শিশুর জন্য সুন্দর শেখার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। অনেক সময় একটা খালি বাক্সই শিশুর কাছে সবচেয়ে বড় খেলনা হয়ে ওঠে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন