
আমার মেয়ের যখন তিন বছর বয়স, তখন থেকেই আশেপাশে একটা প্রশ্ন খুব বেশি শুনতাম, “স্কুলে দিচ্ছেন না এখনো?” শহরের অনেক পরিবারেই এখন প্রি-স্কুল শিক্ষা যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতা হয়ে গেছে। কে কত তাড়াতাড়ি বাচ্চাকে স্কুলে দিলো, কে আগে লিখতে শেখালো, কে আগে ইংরেজি শেখালো, এসব নিয়ে মা-বাবাদের মধ্যেই একধরনের অদৃশ্য চাপ কাজ করে। একসময় আমিও দ্বিধায় পড়ে যেতাম। সত্যিই কি এত ছোট বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করা জরুরী?
পরে ধীরে ধীরে শিশুদের মানসিক বিকাশ নিয়ে পড়তে গিয়ে বুঝলাম, প্রি-স্কুল এর আসল উদ্দেশ্য শুধু অক্ষর বা সংখ্যা শেখানো না। বরং এই সময়টাতে শিশুর সামাজিক, মানসিক আর ভাষাগত বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের প্রথম পাঁচ বছর শিশুর মস্তিষ্ক খুব দ্রুত বিকশিত হয়। এই সময় তারা আশেপাশের পরিবেশ, ভাষা, আচরণ আর সম্পর্ক থেকে সবচেয়ে বেশি শেখে। তাই ভালো প্রি-স্কুল এর পরিবেশ শিশুর সামগ্রিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রি-স্কুল মানেই শুধু পড়াশোনার চাপ না। বরং ভালো প্রি-স্কুল এমন একটা জায়গা, যেখানে শিশুরা খেলতে খেলতে শেখে।
যেমন:
অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশতে শেখা,
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা,
ছোট ছোট নিয়ম মানা,
নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখা,
বা দলবদ্ধভাবে কোনো কাজে অংশ নেওয়া।
আমি নিজের মেয়ের মধ্যেও এটা লক্ষ্য করেছি। বাসায় ও অনেক কিছু জানত, কিন্তু প্রি-স্কুল এ যাওয়ার পর অন্যদের সাথে মিশতে পারা, অপেক্ষা করা আর নিজের কথা স্পষ্টভাবে বলার ক্ষমতা অনেক বেড়েছে।
আরেকটা বিষয় আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস।
প্রি-স্কুল শিশুকে ধীরে ধীরে একটা নির্দিষ্ট নিয়মের পরিবেশের সাথে পরিচিত করায়। নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া, খেলাধুলা, অন্যদের কথা শোনা এগুলো ভবিষ্যতের স্কুল জীবনের জন্য প্রস্তুতি হিসেবেও কাজ করে।
তবে আমি এটাও বিশ্বাস করি, প্রি-স্কুল উপকারী হলেও এটা নিয়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা উচিত না।
আজকাল অনেক জায়গায় খুব ছোট বাচ্চাদের উপর অপ্রয়োজনীয় পড়াশোনার চাপ দেওয়া হয়। তিন-চার বছরের শিশুকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে লিখার অনুশীলন করানো বা অতিরিক্ত বাড়ির কাজ দেওয়া শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের সাথে সবসময় মানানসই না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বয়সে খেলাধুলাভিত্তিক শেখা অনেক বেশি কার্যকর। কারণ ছোট শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই খেলার মাধ্যমেই সবচেয়ে ভালো শেখে।
আরেকটা বিষয় মা-বাবাদের বুঝতে হবে যে সব শিশু একরকম না। কেউ খুব সহজে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়, আবার কেউ একটু বেশি সময় নেয়। তাই শুধু “অন্য বাচ্চারা শুরু করেছে” দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক না।
আমি আর আমার স্বামী মেয়ের জন্য প্রি-স্কুল বেছে নেওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম “পরিবেশ”। শুধু সুন্দর সাজানো ক্লাসরুম বা ইংরেজি বলার দক্ষতা না বরং শিক্ষকরা শিশুর সাথে কেমন ব্যবহার করেন, পরিবেশটা শিশুবান্ধব কিনা, খেলাধুলার সুযোগ আছে কিনা এগুলো দেখেছি। কারণ সত্যি বলতে, এই বয়সে মানসিক নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ভালো প্রি-স্কুল শিশুর বিকাশে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু প্রি-স্কুলেই শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয়ে যায়, এটা ঠিক না।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো “পারিবারিক পরিবেশ” । বাসায় যদি শিশুর সাথে কথা বলা হয়, গল্প শোনানো হয়, খেলতে দেওয়া হয়, ভালোবাসা আর মানসিক সমর্থন দেওয়া হয় তাহলে সেটাই হবে শিশুর বিকাশের জন্য মূল্যবান একটি পদক্ষেপ।
সবশেষে আমি যেটা বুঝেছি—
প্রি-স্কুল শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুর শৈশবটা আনন্দময়, স্বাভাবিক আর মানসিকভাবে নিরাপদ হওয়া।
কারণ এই বয়সে শুধু “আগে শেখা” না, “সুস্থ ও সঠিকভাবে বড় হওয়া” টাই আসল বিষয়।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন