লোগো

হাতে তৈরি লার্নিং রিসোর্স

হাতে তৈরি লার্নিং রিসোর্স

শাহ আলমের ছেলে রাফির বয়স এখন তিন বছর। আশেপাশের অনেক বাচ্চার হাতে রঙিন বই বা খেলনা দেখে মাঝে মাঝে তার খারাপ লাগে। বাজারে গেলে সে দেখে অক্ষর শেখার বোর্ড, সংখ্যা শেখার খেলনা, কথা বলা পুতুল সহ কত কিছু। কিন্তু মাসের শেষে ভাড়া, বাজার আর ওষুধের খরচ মিটিয়ে এসব কেনা প্রায় অসম্ভব।

একদিন রাফির মা পুরোনো কার্টনের বাক্স কেটে বাংলা অক্ষরের মতো কিছু বানাচ্ছিল। রাফি সেটা নিয়ে খেলতে খেলতে “অ”, “ক” বলার চেষ্টা করছিল। তখন শাহ আলম বুঝতে পারে, শিশুকে শেখানোর জন্য সবসময় দামি জিনিস লাগে না। অনেক সময় হাতের কাছের সাধারণ জিনিস দিয়েই দারুণ লার্নিং রিসোর্স তৈরি করা সম্ভব।
শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছোট শিশুরা সবচেয়ে ভালো শেখে শারীরিকভাবে সক্রিয় খেলার মাধ্যমে। অর্থাৎ, যখন তারা নিজে ধরে, নাড়ে, মিলায়, গড়ে বা ব্যবহার করে শেখে। তাই হাতে তৈরি লার্নিং রিসোর্স অনেক সময় দোকানের তৈরি খেলনার চেয়েও কার্যকর হতে পারে। কারণ এতে শিশু শুধু দেখে না, বরং অংশ নেয়।
যেমন, পুরোনো কাগজ বা কার্টন দিয়ে বাংলা অক্ষর কেটে দেয়ালে লাগানো যায়। রাফির মা এখন মাঝে মাঝে চালের বস্তার কাগজে বড় বড় করে অক্ষর লিখে দেয়। রাফি আঙুল দিয়ে সেগুলো ছুঁয়ে দেখে। এতে তার দেখে চিনতে পারার দক্ষতা ও হাতের নড়াচড়া, দুটোই একসাথে কাজ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একসাথে দেখা, ছোঁয়া ও বলা ছোট শিশুদের শেখা দ্রুত ও স্থায়ী করতে সাহায্য করে।
আবার পুরোনো বোতলের ঢাকনা দিয়েও সংখ্যা শেখানো যায়। যেমন, পাঁচটা ঢাকনা একসাথে রেখে “পাঁচ” শেখানো। এতে শিশু সংখ্যার বাস্তব ধারণা পায়। শুধু মুখস্থ না করে সে বুঝতে শেখে সংখ্যা আসলে কী বোঝায়।
শাহ আলম এখন দোকান থেকে ফেলে দেয়া ছোট জুতার বাক্স বাসায় নিয়ে আসে। সেই বাক্স দিয়ে কখনো গাড়ি, কখনো শিক্ষামূলক খেলনা বানিয়ে দেন আবার গোল, চৌকো বা ত্রিভুজ আকার কেটে রাফিকে মিলাতে দেন। 
এই ধরনের খেলায় শিশুর সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং হাত ও আঙুলের সূক্ষ্ম নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা  বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছোট জিনিস ধরা, সাজানো বা ফিট করানোর মতো কাজ শিশুর হাত ও মস্তিষ্কের সমন্বয় উন্নত করে।
হাতে তৈরি লার্নিং রিসোর্স-এর আরেকটা বড় সুবিধা হলো, এগুলো শিশুর বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত হয়।
যেমন, রান্নাঘরের ডাল, চাল বা সবজি দিয়েই রঙ, আকার, সংখ্যা শেখানো যায়। এতে শেখাটা শিশুর কাছে পরিচিত ও সহজ মনে হয়।
অনেক বাবা-মা ভয় পান যে তারা নিজেরা বেশি শিক্ষিত না, তাই ভালোভাবে শেখাতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে ছোট শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যোগাযোগ।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর সাথে কথা বলা, প্রশ্ন করা, একসাথে খেলা শিশুর ভাষা ও চিন্তার বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।
রাফি যখন কার্টনের অক্ষর নিয়ে খেলে, তখন তার মা জিজ্ঞেস করে, “এটা কোনটা?” “ক দিয়ে কী হয়?” এই ছোট কথোপকথনও শিশুর শেখার অংশ।
তবে লার্নিং রিসোর্স বানানোর সময় নিরাপত্তার বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। ধারালো জিনিস, ছোট বোতামের মতো সহজে গিলে ফেলার বস্তু বা বিষাক্ত রঙ ব্যবহার করা ঠিক না। ছোট শিশুদের সবসময় বড়দের নজরের মধ্যে খেলতে দেয়া ভালো।
শাহ আলম এখন বুঝেছে, শেখা শুধু স্কুলের বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। একটা পুরোনো বাক্স, কয়েকটা ঢাকনা, কিছু রঙিন কাগজ দিয়েও শিশুর জন্য আনন্দময় শেখার জগৎ তৈরি করা যায়।
সবচেয়ে বড় কথা, যখন বাবা-মা নিজের হাতে কিছু বানিয়ে শিশুর সাথে সময় কাটান, তখন শুধু শেখা না বরং সম্পর্কও গভীর হয়। হয়তো তাদের বাসায় দামি শিক্ষামূলক জিনিষ নেই, কিন্তু আছে সময়, চেষ্টা আর সন্তানের জন্য কিছু করার ইচ্ছা। আর অনেক সময় এই জিনিসগুলোই শিশুর শেখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপকরণ হয়ে ওঠে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000