লোগো

ভাইবোন Rivalry এর কারণ ও সমাধানের উপায়

ভাইবোন Rivalry এর কারণ ও সমাধানের উপায়

আমার ছেলে যখন ছোট ছিল, তখন বাসার সবার মনোযোগ ওর দিকেই ছিল। কিন্তু মেয়ে হওয়ার পর হঠাৎ করেই সেই মনোযোগ ভাগ হয়ে গেল। আমি এখন বুঝি, ওর ছোট্ট মনে হয়তো তখন একটা ভয় কাজ করত, “আমাকে কি আগের মতো আর ভালোবাসে না?” মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট শিশুদের মধ্যে.....

অফিস থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায়ই রাত হয়ে যায়। ঢাকার ট্রাফিক পার করে যখন বাসায় ঢুকি, তখন মাথার মধ্যে শুধু একটা চিন্তাই থাকে, আজকে একটু শান্তিতে বসতে পারবো তো? কিন্তু দরজা খুলেই প্রায়ই দেখি আমার চার বছরের ছেলে আর দুই বছরের মেয়ে খেলনা নিয়ে ঝগড়া করছে। একজন আরেকজনের হাত থেকে কিছু কেড়ে নিচ্ছে, কেউ কান্না করছে, কেউ চিৎকার করছে।


মনে হতো, “এরা এত ঝগড়া করে কেন?” মাঝে মাঝে মনে হতো আমরা তো একই পরিবার, তাহলে ভাইবোনের মধ্যে এত প্রতিযোগিতা বা হিংসা কেন হবে? কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, এটা আসলে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। বিশেষ করে বয়সে কাছাকাছি দুই সন্তান থাকলে sibling rivalry বা ভাইবোন rivalry অনেক পরিবারেই দেখা যায়।


আমার নিজের পরিবারও যৌথ পরিবার। শ্বশুর-শাশুড়ি আমাদের সাথেই থাকেন। সংসারে মানুষ বেশি থাকলে ভালোবাসাও বেশি থাকে, আবার অজান্তেই তুলনাও বেশি হয়। কেউ হয়তো বলে ফেললেন, “মেয়েটা কত শান্ত!” আবার কখনো ছেলেকে বলা হয়, “তুমি তো বড়, তোমাকেই বুঝতে হবে।” ছোট ছোট এই কথাগুলো শিশুদের মনে কতটা প্রভাব ফেলে, আগে বুঝতাম না।


আমার ছেলে যখন ছোট ছিল, তখন বাসার সবার মনোযোগ ওর দিকেই ছিল। কিন্তু মেয়ে হওয়ার পর হঠাৎ করেই সেই মনোযোগ ভাগ হয়ে গেল। আমি এখন বুঝি, ওর ছোট্ট মনে হয়তো তখন একটা ভয় কাজ করত, “আমাকে কি আগের মতো আর ভালোবাসে না?”


মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট শিশুদের মধ্যে Rivalry এর বড় কারণ হলো Attention Seeking। তারা বাবা-মায়ের মনোযোগ চায়। আর যখন দেখে সেই মনোযোগ অন্য কেউ পাচ্ছে, তখন ভেতরে ভেতরে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।


আমি নিজেও একটা ভুল করতাম। অনেক সময় তুলনা করে ফেলতাম।
“দেখো তোমার বোন কত শান্ত।”
“তুমি কেন এত জেদ করো?”
এখন বুঝি, এই কথাগুলো আসলে পরিস্থিতি আরও খারাপ করছিল। কারণ তখন আমার ছেলে মনে করত, ওর বোনই সবার বেশি প্রিয়।


আরেকটা জিনিস হলো ছোট শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয় না। বড়দের মতো তারা রাগ বা কষ্ট বুঝে সামলাতে পারে না। তাই ছোট একটা খেলনা নিয়েও তাদের কাছে পৃথিবী উল্টে যাওয়ার মতো মনে হয়।


ওদের মধ্যে এখন যখন ঝগড়া হয়, প্রথমত, আমি চেষ্টা করি দুইজনকে আলাদা মানুষ হিসেবে দেখতে। আমার ছেলে চঞ্চল, অনেক প্রশ্ন করে। মেয়ে একটু শান্ত স্বভাবের। এখন আর আমি তাদের একে অপরের সাথে তুলনা করি না।


দ্বিতীয়ত, আমি বুঝেছি বড় সন্তানকে সবসময় “বড় মানুষ” ভাবা ঠিক না। আমরা প্রায়ই বলি, “তুমি বড়, তুমি মানিয়ে নাও।” কিন্তু সে তো এখনো ছোট্ট একটা শিশু। তারও রাগ হয়, কষ্ট হয়, মন খারাপ হয়।
তাই আমরা ওর অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করি।


অফিসের ব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন বেশি সময় দিতে পারি না, এটা সত্যি। মাসের খরচ, বাজার, ওষুধ, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ, সব মিলিয়ে মাথার উপর চাপ তো থাকেই। 
তাও আমি চেষ্টা করি প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় আলাদা করে ওদের সাথে কাটাতে। কখনো ছেলের সাথে গল্প করি, কখনো মেয়েকে নিয়ে হাঁটি। ছোট ছোট এই সময়গুলো তাদের আচরণেও পার্থক্য আনছে।


আরেকটা জিনিস আমি সচেতনভাবে করি। তারা যখন ভালোভাবে একসাথে খেলে, তখন সেটা লক্ষ্য করি।
আগে শুধু ঝগড়ার সময়ই কথা বলতাম। এখন বলি,
“তোমরা একসাথে খেলছো দেখে খুব ভালো লাগছে।”
এতে তারা বুঝতে শিখছে যে সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।


আমি এখন মনে করি, ভাইবোন Rivalry পুরোপুরি খারাপ কিছু না। ছোটখাটো ঝগড়ার মধ্য দিয়েই শিশুরা ভাগাভাগি করা, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা, ধৈর্য ধরা- এসব শিখে।


তবে বাবা-মা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো ঝগড়াকে যুদ্ধ বানিয়ে না ফেলা। শিশুদের এমন একটা পরিবেশ দেওয়া, যেখানে তারা বুঝতে পারে “আমাদের দুজনকেই সমানভাবে ভালোবাসা হয়।”


আমি ও বাবা হিসেবে পার্ফেক্ট না। অনেক সময় ক্লান্তি থেকে ধৈর্য হারিয়ে ফেলি। কিন্তু একটা বিষয় বুঝি, শিশুদের প্রতিটা আচরণের পেছনে একটা অনুভূতি থাকে। সেই অনুভূতিটা বোঝার চেষ্টা করাটাই আসলে Parenting এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000