
আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে একটা বাস্তবতা আছে। বাবা-মা সবসময় একদম স্বাস্থ্যকর খাবার প্রস্তুত করে দিতে পারেন না। আমি অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরি, স্ত্রীও সারাদিন দুই বাচ্চা সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত হয়ে যায় তখন সহজ সমাধান হিসেবে বিস্কুট, চিপস বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার অনেক সময় হাতের কাছেই থাকে। কিন্তু শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আসক্তি ধীরে ধীরে বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে...
আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে একটা বাস্তবতা আছে। বাবা-মা সবসময় একদম স্বাস্থ্যকর খাবার প্রস্তুত করে দিতে পারেন না। আমি অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরি, স্ত্রীও সারাদিন দুই বাচ্চা সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত হয়ে যায় তখন সহজ সমাধান হিসেবে বিস্কুট, চিপস বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার অনেক সময় হাতের কাছেই থাকে।
কিন্তু শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আসক্তি ধীরে ধীরে বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় এবং অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার শিশুদের স্থূলতা, দাঁতের সমস্যা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, এমনকি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।এছাড়া অতিরিক্ত চিনি অনেক শিশুর মনের ওঠানামা এবং অতিরিক্ত চঞ্চলতাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রথমত, বাসায় অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রাপ্যতা কমানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।আগে বাজার করতে গেলে আমিও অনেক সময় বড় প্যাকেট চিপস বা কোমল পানীয় নিয়ে আসতাম। এখন বুঝেছি, বাসায় থাকলে শিশুরা খাবেই। তাই পুরোপুরি না হলেও এর পরিমাণ কমিয়েছি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সামনে যা থাকবে, শিশুরা সেটাই বেশি খেতে চাইবে।
দ্বিতীয়ত, আমরা এখন স্বাস্থ্যকর খাবারকে আকর্ষণীয় করে পরিবেশন করার চেষ্টা করি । আগে ফল খেতে দিলে ছেলে মুখ ফিরিয়ে নিত। পরে আমরা পরিবেশনের ধরনে কিছু পরিবর্তন আনি। যেমন—
● কলা ছোট ছোট করে কেটে দিই
● ফল দিয়ে হাসিমুখের নকশা তৈরি করি
● ঘরে তৈরি দইয়ের সঙ্গে ফল মিশিয়ে দিই
শিশুরা চোখে সুন্দর লাগে এমন জিনিসের প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হয়।
আমার স্ত্রী এখন মাঝে মাঝে বাসায় কিছু স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করার চেষ্টা করে। যেমন—
● ঘরে তৈরি আলুর ওয়েজেস
● চিড়া-মুড়ির স্বাস্থ্যকর মিশ্রণ
● ডিম বা কলার প্যানকেক
● দই ও ফল
এগুলো হয়তো রেস্তোরাঁর খাবারের মতো নয়, কিন্তু ধীরে ধীরে শিশুর স্বাদ গ্রহণের অভ্যাস বদলাতে সাহায্য করে।
অনেক বাবা-মা রা একটা ভুল করে, পুরস্কারহিসেবে অস্বাস্থ্যকর খাবার দেওয়া।
“ভালো ছেলে হলে চকলেট দিবো।”
এতে শিশুর মনে এসব খাবারের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। সে তখন মনে করে চিপস বা চকলেট বিশেষ কোনো পুরস্কার।
আমরা চেষ্টা করি অন্যভাবে উৎসাহ দিতে। যেমন—
● অতিরিক্ত গল্প শোনানো
● পার্কে নিয়ে যাওয়া
● স্টিকার দেওয়া বা আঁকাআঁকির সুযোগ দেওয়া
আরেকটা বড় বাস্তবতা হলো, শিশুরা অনুকরণ করে শেখে। আমি নিজে যদি প্রতিদিন কোমল পানীয় খাই আর শিশুকে বলি “তুমি খাবে না”, তাহলে সেটা খুব একটা কাজে আসবে না।
আমি নিজেও চেষ্টা করি বাচ্চাদের সামনে নিজের খাদ্যাভ্যাস একটু উন্নত করতে। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের খাদ্যাভ্যাস শিশুদের খাবারের পছন্দের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
তবে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ করে সব অস্বাস্থ্যকর খাবার বন্ধ করে দেওয়া অনেক সময় উল্টো ফল দিতে পারে। শিশু তখন সেগুলো আরও বেশি চাইতে শুরু করে।
তাই বিশেষজ্ঞরা ধীরে ধীরে কমানোর পরামর্শ দেন। যেমন—
● প্রতিদিনের বদলে সপ্তাহে একদিন
● বড় প্যাকেটের বদলে ছোট প্যাকেট
● চিনিযুক্ত পানীয় কমিয়ে পানি বা ঘরে তৈরি পানীয় দেওয়া
● বাইরে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্যকর খাবার খাইয়ে নেওয়া
আমি এখনো বলব না যে আমার সন্তানদের অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস পুরোপুরি চলে গেছে। এখনো দোকানের সামনে গেলে ছেলে চিপস চাইবে। কিন্তু আগের মতো প্রতিদিনের যুদ্ধ নেই।
সন্তান পালন মানে নিখুঁত হওয়া নয়। ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করাই আসল বিষয়।
একজন কর্মজীবী বাবা হিসেবে সবসময় আদর্শ খাবার নিশ্চিত করা কঠিন। কিন্তু ছোট ছোট ধারাবাহিক পরিবর্তন ভবিষ্যতে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। কারণ শিশুর খাদ্যাভ্যাস শুধু আজকের খাবার নয়, বরং ভবিষ্যতের সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন