
যমজ ছেলে হওয়ার পর আমাদের বাসা যেন হঠাৎ করেই সবার আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে গেল। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী, সবাই বাচ্চাদের একনজর দেখতে চাইতেন। কেউ মিষ্টি নিয়ে আসছেন, কেউ খেলনা, কেউ আবার শুধু আদর করতে। শুরুতে বিষয়টা আমাদের খুব ভালো লাগত। সত্যি বলতে, নতুন বাবা-মা হিসেবে সবার ভালোবাসা আর আনন্দ দেখে মন ভরে যেত।
কিন্তু কিছুদিন পর আমি আর আমার স্ত্রী একটা বিষয় খেয়াল করলাম। এত মানুষের আসা-যাওয়া, কোলে নেওয়া, কথা বলা আর ছবি তোলার মধ্যে বাচ্চা দুজন খুব দ্রুত অস্থির হয়ে যাচ্ছে। কখনো ঘুম ভেঙে যাচ্ছে, কখনো ঠিকমতো খেতে পারছে না, আবার কখনো এক কোল থেকে আরেক কোলে যেতে যেতে বিরক্ত হয়ে কান্না শুরু করছে।
তখনই আমরা শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলি। সেখান থেকে বুঝতে পারি, নবজাতকের নিরাপত্তা শুধু পড়ে যাওয়া বা ঠান্ডা লাগার বিষয় না। জীবনের প্রথম কয়েক মাসে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠে না। তাই অতিরিক্ত মানুষের সংস্পর্শ, জীবাণু, শব্দ বা অতিরিক্ত কথাবার্তা তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এরপর থেকে আমরা কিছু ছোট ছোট বিষয়ে একটু বেশি সচেতন হতে শুরু করি। যেমন, কেউ বাচ্চাকে কোলে নেওয়ার আগে হাত পরিষ্কার করেছেন কি না, সেটা খেয়াল করি। প্রথমদিকে বিষয়টা বলতে অস্বস্তি লাগত। মনে হতো, মানুষ কী ভাববে? পরে বুঝলাম, শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে ভদ্রভাবে কিছু বলা মোটেও অভদ্রতা না।
এখন কেউ এলে আমরা হাসিমুখেই বলি, “একটু হাত ধুয়ে বা স্যানিটাইজ করে নিন।” মজার বিষয় হলো, বেশিরভাগ মানুষই বিষয়টা খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন।
আরেকটা ব্যাপার আমরা খুব লক্ষ্য করেছি, সবাই বাচ্চাকে কোলে নিতে চান। এটা স্বাভাবিক, কারণ সবাই আদর করতে ভালোবাসেন। কিন্তু এক কোল থেকে আরেক কোলে বারবার যাওয়াটা ছোট শিশুর জন্য ক্লান্তিকর হতে পারে।
আমাদের বাসায় একসময় এমন হতো, অনেক কষ্টে একজনকে ঘুম পাড়ানো হয়েছে, ঠিক তখনই কেউ এসে বলছে, “একটু কোলে নিই।” কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুম ভেঙে যেত।
পরে আমরা বুঝলাম, শিশুর ঘুম আর খাওয়ার সময়টাকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখা দরকার। তাই এখন ঘুমিয়ে থাকলে আর কোলে দেওয়ার চেষ্টা করি না।
আরেকটা বিষয় হলো অসুস্থ অবস্থায় অতিথি দেখা করতে আসা। আমাদের দেশে অনেকেই ভাবেন, সামান্য সর্দি-কাশি কোনো ব্যাপার না। কিন্তু নবজাতকের ক্ষেত্রে সাধারণ ঠান্ডা বা ভাইরাসও কখনো কখনো বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই এখন যদি কারও জ্বর, কাশি বা ফ্লু-এর মতো উপসর্গ থাকে, আমরা বিনয়ের সঙ্গে অন্যদিন আসতে বলি।
শুরুতে এটা বলতে একটু অস্বস্তি লাগলেও পরে বুঝেছি, শিশুর নিরাপত্তার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একেবারেই স্বাভাবিক।
বাচ্চাদের চুমু খাওয়ার বিষয়েও আমরা একটু সতর্ক থাকি। সবাই ভালোবেসেই আদর করেন, কিন্তু খুব ছোট শিশুর মুখে বা হাতে চুমু খাওয়া থেকে কিছু সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই আমরা কাছের মানুষদেরও বলি, “আদর করুন, কিন্তু একটু সাবধানে।”
আরেকটা মজার বিষয় হলো, অনেক অতিথি অজান্তেই শিশুর রুটিন বদলে দেন। কেউ ঘুমন্ত বাচ্চাকে দেখতে গিয়ে জাগিয়ে দেন, কেউ উজ্জ্বল ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তোলেন, কেউ আবার খাওয়ানোর সময়ও কোলে নিতে চান।
এসবের পেছনে অবশ্যই ভালোবাসা থাকে। কিন্তু ছোট শিশুর জন্য এগুলো অনেক সময় অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই এখন আমরা চেষ্টা করি, অতিথিরা এমন সময়ে আসুন যখন বাচ্চাদের ঘুম বা খাওয়ার সময় না থাকে। এতে সবাইও স্বস্তিতে সময় কাটাতে পারেন, আর শিশুরাও বেশি আরাম বোধ করে।
তবে একটা বিষয় আমি খুব বিশ্বাস করি, নবজাতকের নিরাপত্তা মানে তাকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে রাখা না।
পরিবারের মানুষ, আত্মীয়স্বজন আর কাছের মানুষের ভালোবাসা শিশুর বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে আমাদের মতো পরিবারে এই মানসিক সমর্থন নতুন বাবা-মায়ের জন্যও অনেক মূল্যবান।
তাই আসল বিষয় হলো ভারসাম্য।
অতিথিরা আসবেন, আদর করবেন, আনন্দ ভাগ করে নেবেন, এটা সুন্দর। তবে সেই ভালোবাসার পাশাপাশি শিশুর আরাম, পরিচ্ছন্নতা আর নিরাপত্তার দিকেও একটু খেয়াল রাখা দরকার।
এখনো আমাদের বাসায় মানুষ আসে, বাচ্চাদের আদর করে, সময় কাটায়। তবে আগের মতো অগোছালো নয়। সময়ের সঙ্গে আমরা শিখেছি, নবজাতকের জন্য সবচেয়ে ভালো পরিবেশ হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে ভালোবাসার সঙ্গে সচেতনতাও থাকে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন