লোগো

কর্মজীবী বাবা-মায়ের অপরাধবোধ শিশুর উপর কী প্রভাব ফেলে?

কর্মজীবী বাবা-মায়ের অপরাধবোধ শিশুর উপর কী প্রভাব ফেলে?

আমি আর আমার স্বামী দুজনই ডাক্তার। কখন জরুরি ডিউটি পড়বে, কখন রাত হয়ে যাবে, আগে থেকে সবসময় বোঝা যায় না। অনেক দিন এমনও হয়েছে, বাসায় ফিরতে ফিরতে মেয়েটা প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। একজন মা হিসেবে এই বিষয়টা আমাকে ভীষণ খারাপ লাগায়। আর এই খারাপ লাগা থেকেই হয়তো আগে ওর অনেক আবদার খুব সহজে মেনে নিতাম। নতুন খেলনা, বেশি সময় কার্টুন দেখা, বাইরে খেতে যাওয়া ইত্যাদি। মনে হতো, “সময় তো দিতে পারছি না, অন্তত এগুলো দিয়ে খুশি রাখি।”

শুরুতে বিষয়টা স্বাভাবিক মনে হলেও পরে বুঝতে পারলাম, এই অপরাধবোধ ধীরে ধীরে আমার সন্তান লালন-পালনের ধরনকে প্রভাবিত করছে।
মনোবিজ্ঞানে এমন একটি বিষয় আছে, যেটাকে অনেক সময় “অপরাধবোধ থেকে ছাড় দেওয়া” বলা হয়। অর্থাৎ, মা-বাবা নিজেদের খারাপ লাগা কমানোর জন্য সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় হয়ে যান। কর্মজীবী মা-বাবাদের মধ্যে এটি বেশ সাধারণ, বিশেষ করে ব্যস্ত শহুরে জীবনে।
একসময় আমার মনে হতো, সারাদিন বাইরে থাকার পর বাসায় ফিরে আর বকাঝকা বা “না” বলতে চাই না। তাই মেয়ে কিছু চাইলে সহজেই মেনে নিতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে খেয়াল করলাম, ছোট ছোট না-পাওয়াও ও সহজভাবে নিতে পারছে না। কোনো কিছু ওর ইচ্ছামতো না হলেই খুব রেগে যাচ্ছে বা কান্না করছে।
তখন বুঝলাম, শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ছোট ছোট সীমারেখাও প্রয়োজন।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু তখনই বেশি নিরাপদ অনুভব করে যখন তার জীবনে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমা থাকে। সবসময় সব আবদার পূরণ করা বা অপরাধবোধ থেকে নিয়ম বদলে ফেলা দীর্ঘমেয়াদে শিশুর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
আরেকটা বিষয় আমি নিজের মধ্যেই খুব বুঝেছি, শুধু বাসায় থাকলেই শিশুর সঙ্গে সময় দেওয়া হয় না। অনেক সময় আমরা বাসায় থেকেও কাজের চাপ, ফোন বা অন্য চিন্তায় এত ব্যস্ত থাকি যে শিশুরা আমাদের পুরো মনোযোগ পায় না। অথচ অল্প সময় হলেও যদি মন দিয়ে তার কথা শোনা যায়, সেটাই তার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।
এখন আমি চেষ্টা করি বাসায় ফিরে কিছু সময় পুরোপুরি মেয়ের জন্য রাখার। ও গল্প করলে মন দিয়ে শুনি, ছবি আঁকলে দেখি, ছোট ছোট কথাতেও আগ্রহ দেখাই। কারণ আমি বুঝেছি, শিশুরা দামি জিনিসের চেয়ে বাবা-মায়ের মনোযোগ বেশি মনে রাখে।
আগে আরেকটা ভুল আমি করতাম, ক্লান্ত থাকলে সহজ সমাধান হিসেবে মোবাইল বা ট্যাব দিয়ে দিতাম। কিছুক্ষণ শান্ত থাকে, আমিও একটু বিশ্রাম পাই। কিন্তু পরে বুঝলাম, এটা ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। মন খারাপ, একঘেয়েমি বা বিরক্ত লাগলেই স্ক্রিন দরকার হচ্ছে।
এটা সাময়িকভাবে সুবিধাজনক হলেও, শিশুর নিজের অনুভূতি সামলানোর ক্ষমতা গড়ে ওঠার সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
তবে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, কর্মজীবী মা-বাবা হওয়া কোনো খারাপ বিষয় না।
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত থাকেন, তাদের সন্তানরাও সুস্থভাবে বড় হতে পারে। বরং অনেক সময় শিশুরা মা-বাবার পরিশ্রম দেখে দায়িত্ববোধ ও নিয়ম মেনে চলার অভ্যাসও শিখে।
সমস্যা কাজ করার মধ্যে না। সমস্যা তখন হয়, যখন অপরাধবোধ সন্তান লালন-পালনের সিদ্ধান্তগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
আমি এখনো প্রতিদিন সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে পারি না। এখনো অনেক সময় খারাপ লাগে। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা বিষয় বুঝেছি, সন্তান লালন-পালন মানে শুধু সব আবদার পূরণ করা না।
কখনো “না” বলা, নিয়ম মানানো, সীমা শেখানো এগুলোও ভালোবাসারই অংশ।
সবশেষে আমি একটা কথাই বিশ্বাস করি,
শিশুরা সবসময় নিখুঁত মা-বাবা চায় না। তারা শুধু এমন একটা সম্পর্ক চায়, যেখানে তারা বুঝতে পারে, “আমার মা-বাবা ব্যস্ত হতে পারে, কিন্তু আমি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000