লোগো

“সবকিছু পেয়ে যাওয়া” শিশুর ব্যক্তিত্বে কী প্রভাব ফেলে?

“সবকিছু পেয়ে যাওয়া” শিশুর ব্যক্তিত্বে কী প্রভাব ফেলে?

আমি আর আমার husband দুজনই ডাক্তার। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের মেয়ের কোনো প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব নেই। বই, খেলনা, সুন্দর পোশাক, ভালো স্কুল, ঘুরতে যাওয়া; যতটুকু সম্ভব আমরা ওর জন্য সেরাটাই দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু মা হওয়ার পর একটা বিষয় খুব দ্রুত বুঝেছি, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা আর সন্তানের সব চাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করে দেওয়া এক জিনিস না।

কিছুদিন আগে shopping mall-এ একটা ছোট ঘটনা আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল। আমার মেয়ে একটা খেলনা দেখে খুব আবদার করছিল। খেলনাটা কেনার সামর্থ্য আমাদের ছিল, কিন্তু সেদিন ওর আগে থেকেই কয়েকটা নতুন খেলনা ছিল। তাই আমি ওকে বললাম, “আজ না, পরে কিনব।”
কিছুক্ষণ ও মন খারাপ করেছিল, কিন্তু কিছু সময় পর অন্যদিকে মন চলে গেল। সেদিনই মনে হলো, আমরা যদি প্রতিবারই সব আবদার সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করি, তাহলে হয়তো ও অপেক্ষা করার অভ্যাসটাই শিখবে না।
শিশু মনোবিজ্ঞানে delayed gratification বা অপেক্ষা করার দক্ষতাকে ভবিষ্যতের আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলায় ধৈর্য শেখা শিশুরা পরবর্তীতে পরিকল্পনা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং লক্ষ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সফল হয়।
আমি মনে করি, সবকিছু সহজে পেয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাবটা দেখা যায় বড় হওয়ার পরে।
প্রথমত, তারা খুব সহজেই হতাশ হয়ে যেতে পারে। চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিযোগিতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কে যখন প্রথমবার "না" শুনতে হয়, তখন সেটা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। কারণ ছোটবেলা থেকেই তারা অভ্যস্ত ছিল সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো পাওয়ার।
দ্বিতীয়ত, তাদের frustration tolerance বা হতাশা সহ্য করার ক্ষমতা কম থাকতে পারে। সামান্য ব্যর্থতা বা বিলম্বও তাদের কাছে বড় সমস্যা মনে হতে পারে, ফলে সহজেই রাগ, বিরক্তি বা হতাশা তৈরি হয়।
তৃতীয়ত, entitlement mindset তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ, তারা মনে করতে পারে বিশেষ সুবিধা পাওয়াটা স্বাভাবিক এবং অন্যরা তাদের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেবে। এতে কর্মক্ষেত্র, বন্ধুত্ব বা দাম্পত্য জীবনে অযথা দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থের মূল্য বোঝা। ছোটবেলা থেকে প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ হলে অনেক শিশুই বড় হয়ে প্রয়োজন আর ইচ্ছার পার্থক্য বুঝতে শেখে না। এতে অপ্রয়োজনীয় খরচ, আর্থিক পরিকল্পনার অভাব এবং অতিরিক্ত ভোগবাদী জীবনযাপনের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। যে শিশু সবসময় নিজের চাওয়া পূরণ হতে দেখেছে, সে অনেক সময় অন্যের প্রয়োজন, অনুভূতি বা সীমাবদ্ধতাকে গুরুত্ব দিতে শেখে না। ফলে সহমর্মিতা, ভাগাভাগি করা এবং সমঝোতার দক্ষতা গড়ে উঠতে দেরি হতে পারে।
আমি নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে ছোট ছোট নিয়ম অনুসরণ করি। প্রতিটি আবদার সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করি না। কখনো বলি, “এটা জন্মদিনে কিনব”, কখনো বলি, “আগের খেলনাগুলো দিয়ে আগে খেলি।” মাঝে মাঝে ওকে নিজের খেলনা অন্য বাচ্চাদের সাথে ভাগ করে নিতেও উৎসাহ দিই।
আমার কাছে parenting-এর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো এমন একজন মানুষ গড়ে তোলা, যে শুধু সফলই হবে না, বরং ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ, আত্মনিয়ন্ত্রিত এবং অন্যের অনুভূতির প্রতিও সংবেদনশীল হবে।
কারণ বড় হয়ে জীবনে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে যায় তারা, যারা সবকিছু সহজে পায়নি; বরং অপেক্ষা করতে, চেষ্টা করতে, ব্যর্থতা মেনে নিতে এবং নিজের আনন্দ অন্যের সাথে ভাগ করে নিতে শিখেছে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000