
প্রশ্নঃ আমি একজন কর্মজীবী বাবা। আমার ছেলে ৭ বছর বয়সী, ওর ছোট একটা বোন আছে। ও পড়তে বসলে পাঁচ মিনিট পরপর উঠে যায়। কখনো পানি খাবে, কখনো পেন্সিল খুঁজবে, কখনো অন্য কিছু করবে। জোর করলে পড়ে, কিন্তু নিজের থেকে মনোযোগ দিতে পারে না। এটা কি বয়সের কারণে, নাকি অন্য কোনো সমস্যা?
৭ বছর বয়সী শিশুর পড়তে বসে পাঁচ মিনিট পরপর উঠে যাওয়া অনেক বাবা-মায়ের কাছেই খুব পরিচিত সমস্যা। কখনো পানি খাবে, কখনো পেন্সিল খুঁজবে, কখনো বইয়ের বাইরে অন্য কিছুতে মন দেবে, এসব দেখে মনে হতে পারে, “ও কি ইচ্ছা করেই পড়তে চাইছে না?” কিন্তু সবসময় বিষয়টা এত সরল নয়।
এই বয়সে শিশুর মনোযোগ এখনও তৈরি হওয়ার পর্যায়ে থাকে। বড়দের মতো একটানা ৩০–৪০ মিনিট বসে পড়া তার জন্য সহজ নাও হতে পারে। বিশেষ করে স্কুল থেকে ফেরার পর যদি সে ক্লান্ত থাকে, ক্ষুধার্ত থাকে, ঘুম কম হয়, বা বাসায় ছোট বোনের খেলা-শব্দ থাকে, তাহলে মনোযোগ ভেঙে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। তাই প্রথমেই এটাকে “অলসতা” বা “জেদ” ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
তবে এটাও সত্য, কিছু শিশুর ক্ষেত্রে মনোযোগ ধরে রাখা বয়সের তুলনায় বেশি কঠিন হতে পারে। যদি শুধু পড়ার সময় নয়, সাথে করে স্কুলে, খেলাধুলা করার সময়, কোনো কথা শোনার সময়, নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখতে ইত্যাদি প্রায় সব জায়গায় একই সমস্যা দেখা যায়, তখন বিষয়টি একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। বারবার জিনিস হারানো, নির্দেশনা ভুলে যাওয়া, খুব অস্থির থাকা, কথা শেষ হওয়ার আগেই অন্যদিকে চলে যাওয়া, এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। তবে শুধু “পড়তে বসে উঠছে” দেখেই কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়।
বাসায় প্রথম কাজ হলো পড়ার সময় ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা। যেমন, একবারে ৩০ মিনিট পড়তে না বসিয়ে ১০ মিনিট পড়া, ৩ মিনিট বিরতি, আবার ১০ মিনিট, এভাবে শুরু করা যায়। শিশুকে বলা যায়, “এই ১০ মিনিট শুধু এই দুই লাইন পড়ি, তারপর ছোট বিরতি।” কাজ ছোট হলে শিশুর ভয় কমে, শুরু করাও সহজ হয়।
দ্বিতীয়ত, পড়ার জায়গা গুছানো দরকার। টেবিলে শুধু দরকারি বই, খাতা, পেন্সিল থাকবে। পানি, ইরেজার, শার্পনার আগে থেকেই রেখে দিলে বারবার ওঠার অজুহাত কমে। পড়ার সময় টিভি, মোবাইল, খেলনা বা ছোট বোনের দৌড়াদৌড়ি যতটা সম্ভব দূরে রাখা ভালো।
তৃতীয়ত, শিশুকে শুধু “মনোযোগ দাও” বললে অনেক সময় সে বুঝতেই পারে না কী করতে হবে। বরং পরিষ্কার নির্দেশনা দিন: “এই পাঁচটা শব্দ লিখবে”, “এই অঙ্কের প্রথম দুইটা করবে”, “এই প্যারাটা পড়ে আমাকে বলবে কী বুঝলে।” কাজ নির্দিষ্ট হলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়।
চতুর্থত, জোর করার বদলে প্রশংসা ব্যবহার করুন। সে যদি ৫ মিনিটও মন দিয়ে বসে, বলুন, “তুমি আজ শুরুটা খুব ভালো করেছ।” ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো যায়। বারবার বকা দিলে পড়ার সঙ্গে ভয় ও বিরক্তি জুড়ে যায়, তখন সে আরও পালাতে চাইবে।
একজন কর্মজীবী বাবা হিসেবে আপনার সময় কম হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন ১৫–২০ মিনিট পাশে বসে শান্তভাবে পড়ার রুটিন তৈরি করলে শিশুর ভরসা বাড়ে। এই সময়টা যেন শুধু পড়ার চাপ না হয়ে, বাবার সঙ্গে শেখার সময় হয়।
সবশেষে মনে রাখবেন, শিশুর মনোযোগ গড়ে তুলতে ধৈর্য লাগে। নিয়মিত ঘুম, খেলাধুলা, ছোট লক্ষ্য, গুছানো পরিবেশ আর ভালোবাসা, এসব মিলে শিশুকে ধীরে ধীরে নিজের থেকে মনোযোগ দিতে শেখায়।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন