
প্রশ্নঃ আমার দুই ছেলে। বড়টার বয়স ৮ বছর, ছোটটার ৫ বছর। বড় ছেলে কোনো খেলায় বা পড়াশোনায় হারলে খুব ভেঙে পড়ে। রেগে যায়, কান্না করে, আবার বলে সে আর কখনো খেলবে না। ছোট একটা হারও ও মেনে নিতে পারে না। ওকে কীভাবে মানসিকভাবে শক্ত করে গড়ে তুলতে পারি?
৮ বছর বয়সী শিশুর কোনো খেলায় বা পড়াশোনায় হারলে খুব ভেঙে পড়া, কান্না করা, রেগে যাওয়া বা “আমি আর কখনো খেলব না” বলা, এগুলো অনেক বাবা-মায়ের কাছেই চিন্তার বিষয়। তবে প্রথমেই মনে রাখা দরকার, এটি শুধু “জেদ” নয়। অনেক সময় এর পেছনে থাকে ব্যর্থতার ভয়, নিজেকে কম মনে করা, বা সবকিছুতেই ভালো করতে হবে, এমন চাপ।
এই বয়সে শিশুরা জেতা-হারা, ভালো-মন্দ, প্রথম-দ্বিতীয়, এসব বিষয় খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখে। বড় ছেলে যদি মনে করে “হারলে আমি খারাপ” বা “আমি না পারলে সবাই হতাশ হবে”, তাহলে ছোট একটি হারও তার কাছে বড় আঘাতের মতো লাগতে পারে। তাই তাকে মানসিকভাবে শক্ত করার মানে হলো তাকে কাঁদতে মানা করা নয়; বরং হার মানেই শেষ নয়, হার শেখারই একটি অংশ; এটি শেখানো।
প্রথমে তার অনুভূতিকে স্বীকার করতে হবে। সে হারলে সঙ্গে সঙ্গে “এত কান্নার কী আছে?” বা “ছেলেরা এভাবে কাঁদে না”,এ ধরনের কথা বলা ঠিক নয়। এতে শিশু নিজের অনুভূতি লুকাতে শেখে, সামলাতে নয়। বরং বলা যায়, “তুমি হারায় খুব কষ্ট পেয়েছ, তাই না? আমি বুঝতে পারছি।” এরপর একটু শান্ত হলে বলা যায়, “চলো দেখি, পরের বার কী করলে ভালো হতে পারে।”
দ্বিতীয়ত, শুধু ফলাফল নয়, চেষ্টা ও উন্নতিকে প্রশংসা করুন। “তুমি জিতেছ, তাই ভালো” বলার বদলে বলুন, “তুমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছ”, “আগের চেয়ে আজ ভালো খেলেছ”, “ভুলটা বুঝতে পেরেছ, এটাই শেখা।” এতে শিশুর মনে হয়, তার মূল্য শুধু জেতার উপর নির্ভর করছে না।
তৃতীয়ত, বাড়িতে ছোট ছোট হারের অভ্যাস করানো যায়। যেমন লুডু, ক্যারম, পাজল, মেমোরি গেম, এসব খেলায় কখনো সে জিতবে, কখনো হারবে। কিন্তু প্রতিবার হারলে আলোচনা করুন, “হারলে আমরা কী করি?” পরিবারের সবাই মিলে একটি নিয়ম করা যায়: “হারলে রাগ হতে পারে, কিন্তু জিনিস ছোড়া যাবে না, খেলা ছেড়ে পালানো যাবে না, আর অন্যকে দোষ দেওয়া যাবে না।”
চতুর্থত, বাবা-মা নিজেরাও ভালো উদাহরণ দেখাবেন। আপনি যদি কোনো কাজে ভুল করেন, তখন বলুন, “আচ্ছা, এটা ঠিক হলো না। আবার চেষ্টা করি।” শিশু তখন দেখে, বড়রাও ভুল করে, কিন্তু থেমে যায় না। এই মডেলিং শিশুর জন্য খুব শক্তিশালী শিক্ষা।
পঞ্চমত, ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। “তোমার ভাই তো এত কান্না করে না”, এ কথা বড় ছেলের আত্মবিশ্বাস আরও কমাতে পারে। বরং বড় ছেলেকে আলাদাভাবে সময় দিন, যেন সে বুঝতে পারে সে শুধু “বড় ভাই” নয়, সে নিজেও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি কাজ করা যায়, হারার পর একটি “শান্ত হওয়ার রুটিন” বানানো। যেমন তিনবার গভীর শ্বাস, এক গ্লাস পানি, ৫ মিনিট বিরতি, তারপর কথা বলা। এতে সে রাগের সময় কী করবে, তার হাতে একটি সহজ পথ থাকে।
তবে যদি শিশুর হার সহ্য না করার সমস্যা খুব বেশি বাড়ে, স্কুলে প্রভাব পড়ে, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়, বা সে বারবার নিজেকে “খারাপ” বলে, তাহলে শিশু মনোবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সবচেয়ে জরুরি কথা হলো, শিশুকে শক্ত করতে হলে তাকে কঠিন কথা নয়, নিরাপদ জায়গা দিতে হয়। বাবা-মায়ের শান্ত সাপোর্ট, চেষ্টা-কেন্দ্রিক প্রশংসা এবং নিয়মিত অনুশীলন তাকে ধীরে ধীরে শেখাবে, হার জীবনের শেষ নয়, বরং পরের বার আরও ভালো করার শুরু।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন