লোগো

“ইংলিশ মিডিয়াম বনাম বাংলা মিডিয়াম” শহুরে বাবা-মায়ের দ্বিধা

“ইংলিশ মিডিয়াম বনাম বাংলা মিডিয়াম” শহুরে বাবা-মায়ের দ্বিধা

আমাদের মেয়ের স্কুলে ভর্তি করার সময় আমি আর আমার স্বামী সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটা শুনেছি, সেটা হলো, “ইংলিশ মিডিয়ামে দিচ্ছেন না?” ঢাকার শহুরে প্যারেন্টিং কালচার -এ সত্যি বলতে একটা নীরব চাপ কাজ করে। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ইংলিশ মিডিয়াম মানেই ভালো শিক্ষা, ভালো ভবিষ্যৎ, ভালো আত্মবিশ্বাস। আবার অন্যদিকে উল্টো বিচারও আছে। অনেক বাংলা মাধ্যম পরিবার মনে করে ইংলিশ মিডিয়ামের বাচ্চারা বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যায়। এমনকি ছোট বাচ্চাদের মধ্যেও অকারণ একটা বিভাজন তৈরি হয়, “ও ইংলিশ মিডিয়াম”, “ও বাংলা মিডিয়াম”।

কিন্তু একজন মা হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আসলে ইংলিশ মিডিয়াম বা বাংলা মিডিয়াম  কোনোটাই এককভাবে সবসময় “ভালো” বা “খারাপ” না। দুটো সিস্টেমেরই আলাদা শক্তি আছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোন পরিবেশটা আপনার শিশুর স্বভাব, শেখার ধরন এবং পারিবারিক বাস্তবতার সাথে মানানসই।
আমি আর আমার স্বামী দুজনই ব্যস্ত পেশায় আছি। আমাদের রুটিন অনেক সময়ই অনিশ্চিত। কখনো ডিউটি, কখনো জরুরি কাজ, কখনো দেরি পর্যন্ত থাকা। তাই আমরা বুঝেছিলাম, খুব বেশি চাপযুক্ত এবং প্রতিদিন কঠোর একাডেমিক রুটিন আমাদের জন্য বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
এই কারণেই আমরা মেয়েকে একটি ভালো বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেছি। পাশাপাশি ওর ইংরেজি কথা বলা এবং আরবি শেখার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রেখেছি।
কারণ আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে যেন নিজের মাতৃভাষায় শক্ত হয়। নিজের ভাষায় স্পষ্টভাবে ভাবতে, বুঝতে এবং প্রকাশ করতে শেখে, এটা আমরা খুব গুরুত্ব দিই।
অনেক বাবা-মা একটা বিষয় অনেক সময় খেয়াল করেন না, শিশুর পড়াশোনা শুধু শিশুর দায়িত্ব না, এটা পুরো পরিবারের জীবনযাত্রার সাথেও জড়িত।
বিশেষ করে ছোট বয়সে পড়াশোনা, হোমওয়ার্ক, রুটিন; অনেকটাই বাবা-মায়ের ওপর নির্ভর করে। তাই স্কুল নির্বাচন শুধু সামাজিক অবস্থান দিয়ে না, পরিবারের সক্ষমতা দিয়েও বিবেচনা করা দরকার।
সব শিশু এক ধরনের চাপের মধ্যে ভালো করে না। কেউ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ভালো শেখে, আবার কেউ তুলনামূলক শান্ত ও সমন্বিত পরিবেশে বেশি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়।
আর বাস্তব কথা হলো, একজন শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু স্কুলের মাধ্যম দিয়ে নির্ধারণ হয় না। তার আত্মবিশ্বাস, কথা বলার দক্ষতা, আবেগ বোঝার ক্ষমতা, কৌতূহল, শৃঙ্খলা; এগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন অনেক বাংলা মাধ্যম শিক্ষার্থী দেখেছি যারা পরে জীবনে অসাধারণ করেছে। আবার ইংলিশ মিডিয়াম থেকে আসা অনেক শিশুকে দেখেছি যারা মানসিক চাপের কারণে সংগ্রাম করেছে।
তাই এখন আমি “কোনটা ভালো”, এই বিতর্কে আর বিশ্বাস করি না।
বরং আমি মনে করি, বাবা-মা হিসেবে আমাদের ভাবা উচিত
আমার সন্তান কোথায় মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে, কোথায় স্বাভাবিকভাবে শিখতে পারবে, আর কোন জীবনধারা আমাদের পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব।
কারণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার লক্ষ্য শুধু ভালো ইংরেজি শেখা না। বরং একজন ভারসাম্যপূর্ণ, আত্মবিশ্বাসী এবং আবেগগতভাবে নিরাপদ মানুষ তৈরি করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আর একটা বিষয় আমি এখন খুব স্পষ্টভাবে বুঝি, ভাষা হলো শুধু মাধ্যম, পরিচয় নয়। শিশু যদি নিজের শিকড়ের সাথে সংযুক্ত থেকে নতুন ভাষাও শিখতে পারে, তাহলে সে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসীভাবে বড় হতে পারে। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত “বিভাজন” না, বরং “সমন্বয়”, যাতে শিশু একসাথে নিজের সংস্কৃতি এবং আধুনিক দক্ষতা দুটোই নিয়ে এগোতে পারে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000