লোগো

সবচেয়ে দামী খেলনা কি বাবা-মায়ের মনোযোগের বিকল্প হতে পারে?

সবচেয়ে দামী খেলনা কি বাবা-মায়ের মনোযোগের বিকল্প হতে পারে?

সন্তান হওয়ার পর একটা জিনিস আমি খুব কাছ থেকে বুঝেছি, বাজারে শিশুদের জন্য জিনিসের কোনো শেষ নেই। দামি মিউজিক্যাল খেলনা, স্মার্ট শেখার যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় দোলনা, বিদেশি অ্যাক্টিভিটি সেট দেখে অনেক সময় মনে হয়, “এসব না কিনলে বুঝি শিশুর বিকাশ পিছিয়ে যাবে।” আমাদের মতো উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে এই চাপ আরও বেশি। আত্মীয়স্বজনও অনেক সময় বলেন, “বাচ্চাদের জন্য সেরা জিনিসটাই তো নিতে হবে।” আমিও শুরুতে ভাবতাম, বেশি দামি খেলনা মানেই হয়তো বেশি শেখা।

কিন্তু যমজ ছেলে হওয়ার পর ধীরে ধীরে বুঝলাম, শিশুর বিকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী বিষয় আসলে খেলনা না, বরং মা-বাবার মনোযোগ।
গবেষণা অনুযায়ী, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় সাড়া দেওয়া মানবিক যোগাযোগের মাধ্যমে। Harvard Center on the Developing Child বলছে, শৈশবের শুরুতে “serve and return interaction”, অর্থাৎ শিশু কোনো সংকেত দিল আর পরিচর্যাকারী তার সাড়া দিল, এই যোগাযোগ মস্তিষ্কের গঠন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ, শিশু যখন বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে আর বাবা সাড়া দেন, তখন তার মস্তিষ্কে বাস্তব শেখার সংযোগ তৈরি হয়।
একটা মজার বিষয় হলো, নবজাতক বা ছোট শিশু দামি খেলনার “দাম” বোঝে না। সে বোঝে যোগাযোগ, শব্দ, মুখ, স্পর্শ আর মনোযোগ।
আমি নিজেই এটা বুঝেছি একটা ছোট ঘটনার মাধ্যমে। বাসায় অনেক রঙিন বিদেশি খেলনা থাকার পরও আমার ছেলেরা অনেক সময় একটা সাধারণ কাঠের চামচ বা কাপড় নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সাড়া দেয় যখন আমরা ওদের সঙ্গে কথা বলি বা খেলি।
American Academy of Pediatrics-এর মতে, মা-বাবা ও শিশুর একসঙ্গে খেলা শিশুর ভাষা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক বিকাশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
দামি খেলনা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়, বিষয়টা এমন না। ভালো মানের নিরাপদ খেলনা সংবেদনশীলতা, চলাচলের দক্ষতা এবং কল্পনাশক্তি বিকাশে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন খেলনা যোগাযোগের জায়গা দখল করতে শুরু করে।
অনেক সময় দেখা যায়, মা-বাবা খুব ব্যস্ত। তাই অপরাধবোধ থেকে দামি খেলনা কিনে দেন। কিন্তু শিশু মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, শিশু বস্তুগত জিনিসের চেয়ে আবেগগত সংযোগকে অনেক বেশি মূল্য দেয়।
বিশেষ করে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে শিশুর সবচেয়ে বড় “শেখার উপকরণ” হলো মানুষ।
যখন মা-বাবা,
● কথা বলেন
● গল্প করেন
● গান গেয়ে শোনান
● চোখে চোখ রেখে তাকান
● খেলেন
● সাড়া দেন
তখন শিশুর আবেগগত নিরাপত্তা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অতিরিক্ত উদ্দীপনা।
বর্তমানে অনেক দামি খেলনায় ঝলমলে আলো, উচ্চ শব্দ এবং দ্রুত চলাচলের ব্যবস্থা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো শিশুকে কিছু সময় ব্যস্ত রাখলেও, অতিরিক্ত উদ্দীপনা ছোট শিশুর মনোযোগ নিয়ন্ত্রণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি, সাধারণ ইন্টারঅ্যাকটিভ খেলা অনেক সময় ব্যাটারিচালিত ঝলমলে খেলনার চেয়ে বেশি অর্থবহ হয়।
যেমনঃ
● লুকোচুরি খেলা
● ছড়া বলা
● ব্লক সাজানো
● ছবির বই দেখা
● অনুকরণমূলক খেলা
● দৈনন্দিন জিনিসপত্র অন্বেষণ করা
এসব কাজে মা-বাবার অংশগ্রহণ থাকে। আর সেখানেই আসল শেখা হয়।
গবেষণা আরও বলছে, নিরাপদ আবেগগত সম্পর্ক শিশুর ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই সম্পর্ক দামি উপহার দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় নিয়মিত মনোযোগ দিয়ে।
যৌথ পরিবারে আরেকটা বিষয় প্রায়ই দেখি, শিশুকে শান্ত রাখতে দ্রুত নতুন খেলনা এনে দেওয়া হয়। কিছু সময়ের জন্য কাজও করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শিশুর আবেগগত চাহিদা আর বিনোদনের চাহিদা এক জিনিস না, এটা বুঝতে হবে।
শিশু অনেক সময় খেলনা না, মনোযোগ চায়।
তবে এটাও সত্যি, আধুনিক জীবনে সবসময় পুরো মনোযোগ দেওয়া সম্ভব না। মা-বাবার কাজ থাকবে, ক্লান্তি থাকবে। তাই সবকিছু নিখুঁত হবে, এমন আশা করাও বাস্তবসম্মত না।
কিন্তু ছোট ছোট নিয়মিত মুহূর্ত খুব শক্তিশালী হতে পারে।
যেমনঃ
● রাতে ২০ মিনিট নিরবচ্ছিন্ন খেলা
● খাওয়ানোর সময় কথা বলা
● বাইরে ঘুরতে গিয়ে একসঙ্গে সময় কাটানো
● মোবাইল দূরে রেখে যোগাযোগ করা
এসব বিষয় শিশুর আবেগগত স্মৃতিতে বেশি প্রভাব ফেলে।
সবশেষে আমার মনে হয়, দামি খেলনা শিশুর জন্য অতিরিক্ত আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু মা-বাবার মনোযোগ শিশুর বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে। কারণ দামি খেলনা হয়তো শিশুকে কিছু সময় ব্যস্ত রাখবে, কিন্তু মা-বাবার মনোযোগ শিশুকে শেখায়, “আমি গুরুত্বপূর্ণ, আমাকে শোনা হচ্ছে, আমি নিরাপদ।”
আর একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস ও সুস্থ বিকাশের জন্য এই অনুভূতির মূল্য যেকোনো খেলনার দামের চেয়েও অনেক বেশি।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000