
আমাদের বাসায় যেহেতু যৌথ পরিবার, আর আমি ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকি, তাই গৃহকর্মী বা সহায়তাকারী কর্মীদের উপর অনেক কাজ নির্ভর করে। বিশেষ করে যমজ ছেলে হওয়ার পর বুঝেছি, শিশুকে বড় করতে শুধু মা-বাবা না, বাসার পরিবেশও অনেক বড় ভূমিকা রাখে।
একদিন একটা ছোট ঘটনা আমাকে বেশ ভাবিয়েছিল। আমাদের বাসার একজন কর্মী ভুল করে শিশুর দুধের বোতল ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত করেনি। আমি একটু বিরক্ত হয়ে উঁচু গলায় কথা বলেছিলাম। পরে দেখি, আমার বড় ছেলে, দুজনের একজন আমার মুখের দিকে খুব মন দিয়ে তাকিয়ে আছে। তখন হঠাৎ মনে হলো, শিশুরা শুধু কথা শোনে না, আচরণও পর্যবেক্ষণ করে।
মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, শিশুরা সামাজিক শেখার মাধ্যমে অনেক কিছু শেখে। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার Social Learning Theory বলছে, শিশু বড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং পরে সেটি অনুকরণ করতে শেখে।
তাই কর্মী, চালক, গৃহকর্মী বা সহায়তাকারী মানুষের সঙ্গে আমাদের ব্যবহার শুধু ভদ্রতার বিষয় না; এটা শিশুর চরিত্র গঠনেরও অংশ।
অনেক পরিবারে এখনো একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি দেখা যায়, কর্মীদের সামনে অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করা, ছোট করা, “ওরা নিচু” ধরনের মনোভাব দেখানো। সমস্যা হলো, শিশু খুব দ্রুত শ্রেণিভেদ এবং আচরণের ধরন আত্মস্থ করে।
যদি একটি শিশু বারবার দেখে,
● ক্ষমতাবান মানুষ রূঢ়ভাবে কথা বলছে
● ভুল হলে অপমান করা হচ্ছে
● কর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা কম দেখানো হচ্ছে
তাহলে সে ধীরে ধীরে এই আচরণকেই স্বাভাবিক মনে করতে পারে।
গবেষণা অনুযায়ী, শৈশবের পরিবেশ শিশুর সহমর্মিতা ও সামাজিক আচরণ গঠনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এখন একটা বিষয় খুব সচেতনভাবে অনুসরণ করার চেষ্টা করি, ভুল ধরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন হলেও অসম্মান না করা। কারণ শৃঙ্খলা আর অপমান এক জিনিস না। যদি কোনো কর্মী ভুল করেন, এখন আমি চেষ্টা করি শান্তভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে। এতে দুইটা লাভ হয়,
১. পরিবেশ অপ্রয়োজনীয়ভাবে উত্তেজনাপূর্ণ হয় না
২. শিশুরা সম্মানজনক যোগাযোগ শেখে
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃতজ্ঞতা শেখানো।
আমাদের সমাজে অনেক শিশু এমনভাবে বড় হয়, যেখানে গৃহকর্মীদের উপস্থিতি “স্বাভাবিক সেবা” হিসেবে দেখে। ফলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস তৈরি হয় না।
এখন আমরা বাসায় ছোট ছোট সম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করার চেষ্টা করি। যেমন:
● “ধন্যবাদ” বলা
● “অনুগ্রহ করে” বলা
● কর্মীদের নাম ধরে সম্মান দিয়ে ডাকা
শিশুরা এগুলো দেখেই সামাজিক আচরণ শেখে।
American Academy of Pediatrics বলছে, আবেগগত আচরণের উদাহরণ শিশুদের সহমর্মিতাপূর্ণ সামাজিক আচরণ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, শিশুরা সহমর্মিতা ও সম্মানজনক ব্যবহার মূলত বড়দের আচরণ দেখেই শেখে।
তবে এটাও সত্যি, সুস্থ সীমারেখা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
সম্মানজনক হওয়া মানে অভিভাবকের দায়িত্ব পুরোপুরি কর্মীদের উপর ছেড়ে দেওয়া না। অনেক উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে দেখা যায়, শিশুর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে আয়া বা গৃহকর্মী, আর মা-বাবার সরাসরি যোগাযোগ কমে যাচ্ছে।
গবেষণা অনুযায়ী, স্থায়ী পরিচর্যাকারী উপকারী হলেও শিশুর প্রধান আবেগগত সম্পর্ক এখনো মা-বাবার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি যুক্ত।
তাই কর্মীদের সহায়তা মূল্যবান, কিন্তু সেটা কখনোই মা-বাবার আবেগগত সম্পৃক্ততার বিকল্প হওয়া উচিত না।
আরেকটা বিষয় আমি যৌথ পরিবারে প্রায়ই দেখি, অনেক সময় শিশুর সামনে কর্মীদের নিয়ে ঠাট্টা বা শ্রেণিভিত্তিক মন্তব্য করা হয়। যেমন:
“ওদের মতো আচরণ করো না।”
“ওরা এসব বোঝে না।”
এই ধরনের কথা শিশুর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ববোধ বা শ্রেণিগত পক্ষপাত তৈরি করতে পারে।
শিশু মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, সহমর্মিতা গড়ে তুলতে হলে শিশুকে ছোটবেলা থেকেই মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে শেখানো দরকার। অর্থাৎ, কাজের ধরন দিয়ে মানুষের সম্মান নির্ধারণ হয় না, এই ধারণা পরিবার থেকেই শেখানো জরুরি।
সবশেষে আমি একটা জিনিস বুঝেছি, শিশুর চরিত্র শুধু তাকে কী শেখানো হচ্ছে সেটা দিয়ে না, সে প্রতিদিন কী দেখছে সেটা দিয়েও তৈরি হয়। আমরা কর্মীদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলি, আচরণ করি, প্রতিক্রিয়া দেখাই, শিশুরা নীরবে সেগুলো আত্মস্থ করছে।
কারণ একটি শিশু অনেক সময় আমাদের উপদেশের চেয়ে আমাদের আচরণ থেকেই বেশি শেখে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন