
অফিস থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক দিনই আমার মনে হয় আমি যেন পুরোপুরি খালি হয়ে গেছি। সকালে বের হওয়ার সময় বাচ্চারা তখনো আধা ঘুমে থাকে, আর রাতে ফিরতে ফিরতে তারা কেউ খেতে বসেছে, কেউ ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাঝে মাঝে আমার চার বছরের ছেলে দৌড়ে এসে খেলতে চায়, মেয়ে কোলে উঠতে চায়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, সবসময় সেই শক্তিটা আমার থাকে না।
আমি আগে ভাবতাম ক্লান্তি শুধু আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। অফিসের চাপ অফিসেই শেষ। কিন্তু বাবা হওয়ার পর বুঝেছি, একজন কর্মজীবী বাবার ক্লান্তি পুরো পরিবারে প্রভাব ফেলে।
আমাদের দেশের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারেই বাবারা একমাত্র উপার্জনকারী। আমার নিজের সংসারেও তাই। মাস শেষে বাসা ভাড়া, বাজার, বাচ্চাদের খরচ, ওষুধ, ভবিষ্যতের চিন্তা এসব মিলিয়ে মাথার ভেতরে একটা অদৃশ্য চাপ সবসময় কাজ করে। এর সাথে অফিসের লক্ষ্য পূরণের চাপ, যানজট, চাকরির অনিশ্চয়তা যোগ হলে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হওয়াটা খুব স্বাভাবিক।
কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা পুরুষরা ছোটবেলা থেকেই একটা কথা শুনে বড় হই, “পুরুষ মানুষ ক্লান্তি দেখায় না।” ফলে অনেকেই নিজের মানসিক চাপ চেপে রাখে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ধৈর্য কমতে থাকে।
আমি নিজেও খেয়াল করেছি, যেদিন অফিসে খুব চাপ যায়, সেদিন বাসায় ফিরে ছোটখাটো বিষয়েও বিরক্ত হয়ে যাই। ছেলে একটু বেশি শব্দ করল, মেয়েটা কান্না করল, তখন রাগটা অস্বাভাবিকভাবে বের হয়ে আসে। পরে আবার নিজের কাছেই খারাপ লাগে।
মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ ক্লান্ত মানুষ নিজের অনুভূতি সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই কর্মজীবী মা-বাবা, বিশেষ করে বাবারা, অনেক সময় না বুঝেই পরিবারের উপর সেই চাপটা ছড়িয়ে দেন।
এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে শিশুদের উপর।
শিশুরা খুব সংবেদনশীল পর্যবেক্ষক। তারা সবকিছু ভাষায় বুঝতে না পারলেও পরিবেশ বুঝতে পারে। বাবা যদি সবসময় ক্লান্ত, রাগী বা মানসিকভাবে দূরে থাকেন, তাহলে শিশুর মনে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
আমি একদিন বিষয়টা খুব স্পষ্টভাবে বুঝেছিলাম। অফিস থেকে ফিরে মোবাইল হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে ছিলাম। ছেলে কয়েকবার এসে কিছু বলতে চেয়েছিল, আমি শুধু “পরে বলো” বলেছিলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি সে আর আসছেই না। তখন হঠাৎ মনে হলো, আমি তো সংসারের জন্য এত কষ্ট করছি, কিন্তু সেই সংসারের মানুষগুলোকেই সময় দিতে পারছি না।
এটা শুধু আবেগের বিষয় না, গবেষণাও বলছে পারিবারিক যোগাযোগের মান শিশুদের মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। বাবা যদি নিয়মিত সন্তানের সাথে কথা বলেন, খেলেন, মনোযোগ দেন, তাহলে শিশুর ভাষা বিকাশ, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক নিরাপত্তাবোধ উন্নত হতে পারে।
অন্যদিকে সবসময় টেনশনের পরিবেশ থাকলে শিশু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারে বা নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে পারে।
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্লান্ত হওয়া মানে খারাপ বাবা হওয়া না। ক্লান্ত হওয়া স্বাভাবিক। সমস্যা তখনই হয়, যখন আমরা সেটা বুঝতে না পেরে পরিবারের উপর ঝেড়ে ফেলি।
আমি এখন কিছু ছোট পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি।
প্রথমত, বাসায় ঢুকেই কয়েক মিনিট নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করি। আগে অফিসের হতাশা নিয়েই ঘরে ঢুকতাম। এখন বুঝি, বাচ্চারা সারাদিন অপেক্ষা করে থাকে বাবাকে দেখবে বলে। তাই দরজার ভেতরে ঢোকার পর অন্তত প্রথম ১৫ মিনিট মোবাইল দূরে রাখার চেষ্টা করি।
দ্বিতীয়ত, আমি এখন ক্লান্তি নিয়ে কথা বলি। আগে মনে হতো পরিবারের সামনে দুর্বলতা দেখানো ঠিক না। কিন্তু এখন স্ত্রীকে বলি, “আজকে দিনটা খুব কঠিন গেছে।” এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে।
আমার বাবা-মাও আমাদের সাথে থাকেন। আগে অনেক সময় তাদের কথায় বিরক্ত হতাম। এখন বুঝি, প্রজন্মগত পার্থক্য থাকলেও তারা সাহায্য করতে চান। যৌথ পরিবারে যোগাযোগ ভালো না হলে ক্লান্তি আরও বাড়তে পারে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো ঘুম এবং বিশ্রাম। আমরা অনেক বাবা ভাবি নিজের যত্ন নেওয়া বিলাসিতা। কিন্তু একজন বাবা যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন, তাহলে তার প্রভাব পুরো পরিবারেই পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও অবসাদ মানুষের আচরণ, সম্পর্ক এবং সন্তান পালনের মানের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
আমি এখনো প্রতিদিন নিখুঁতভাবে সবকিছু সামলাতে পারি না। অনেক দিন এখনো রাগ হয়ে যায়, ধৈর্য কমে যায়। কিন্তু অন্তত এখন বুঝি পরিবার শুধু টাকা দিয়ে চলে না, মানসিক উপস্থিতিও লাগে।
আমার ছেলে হয়তো সবসময় মনে রাখবে না আমি কত অতিরিক্ত সময় কাজ করেছি। কিন্তু সে মনে রাখবে আমি ক্লান্ত থাকার পরও তার পাশে বসেছিলাম কিনা। আমার মেয়ে হয়তো বুঝবে না কিস্তি বা ঋণের চাপ কী, কিন্তু সে বুঝবে বাবা তাকে সময় দিয়েছিল কিনা।
কর্মজীবী বাবা হওয়া কঠিন। কিন্তু ক্লান্তির মাঝেও পরিবারকে অনুভব করানো, “আমি তোমাদের জন্য আছি” সম্ভবত সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আর অনেক সময় সন্তানের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার কোনো খেলনা, টাকা বা ঘোরাঘুরি নয়; বরং দিনের শেষে বাবার কয়েক মিনিটের আন্তরিক মনোযোগ, একটি গল্প, একটি আলিঙ্গন বা মন দিয়ে শোনা কয়েকটি কথাই তাদের মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ ফেলে। ছোট ছোট এই মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে পরিবারের সম্পর্ককে শক্ত করে, সন্তানের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে এবং তাকে জানায়, “বাবা ব্যস্ত হতে পারেন, ক্লান্তও হতে পারেন, কিন্তু তিনি আমার পাশে আছেন।”
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন