
একদিন মেয়েকে নিয়ে শপিং মলে গিয়েছিলাম। ও একটা খেলনা পছন্দ করেছিল। সেদিন সেটি কেনার কোনো পরিকল্পনা ছিল না, তাই আমি বলেছিলাম, “আজ না।” কিন্তু ওর প্রতিক্রিয়া আমাকে একটু অবাক করেছিল। খুব বিরক্ত হয়ে বলছিল, “কেন না? আমি তো এটা চাই!”
বাসায় ফিরে বিষয়টা নিয়ে অনেকক্ষণ ভাবছিলাম। শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই কিছু চাইবে, এটা একদম স্বাভাবিক। কিন্তু কখন “চাওয়া” ধীরে ধীরে “আমার এটা পাওয়াই উচিত” এই মানসিকতায় বদলে যায়, সেটা আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না।
বিশেষ করে আমাদের মতো শহুরে ব্যস্ত পরিবারে এই পরিবর্তনটা খুব নীরবে তৈরি হতে পারে। আমরা ব্যস্ত থাকি, সন্তানকে ভালো কিছু দিতে চাই, আবার অনেক সময় অপরাধবোধ থেকেও দ্রুত সবকিছু দিয়ে ফেলি। ফলে ধীরে ধীরে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে শিশুর কাছে অনেক কিছু খুব সহজে পাওয়া যায়।
কিন্তু আত্মবিশ্বাস আর অধিকারবোধ, এই দুটো এক জিনিস না।
আত্মবিশ্বাসী শিশু নিজের সক্ষমতার ওপর ভরসা করে। আর অধিকারবোধ বেশি হয়ে গেলে শিশু মনে করতে শুরু করে, সবকিছু তার ইচ্ছামতো হওয়াই স্বাভাবিক।
এই মানসিকতা সাধারণত ছোটবেলা থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়, যেমনঃ সব আবদার সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হওয়া, কোনো অপেক্ষা না শেখা, বা কোনো চেষ্টা ছাড়াই পুরস্কার পাওয়া।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট বয়সে “অপেক্ষা করতে শেখা” বা বিলম্বিত সন্তুষ্টি (ডিলে গ্রাটিফিকেশন) শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে না পাওয়া, অপেক্ষা করা, আর চেষ্টা করার পর কিছু পাওয়া, এই অভিজ্ঞতা থেকেই ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।
আমি নিজে একটা বিষয় বুঝেছি, সীমারেখা বা নিয়ম শিশুর আবেগিক বিকাশের জন্য খুব জরুরি।
আগে আমি অনেক সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে “না” বলা এড়িয়ে যেতাম। মনে হতো, সারাদিন বাইরে থাকার পর ওর ছোট একটা চাওয়া না মানলে খারাপ লাগবে। কিন্তু পরে বুঝেছি, সবসময় “হ্যাঁ” শুনতে শুনতে শিশুর ধৈর্য আর কৃতজ্ঞতা, দুটোই কমে যেতে পারে।
এখন আমি কিছু ছোট পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি।
প্রথমত, সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে দিই না। কোনো কিছু চাইলে মাঝে মাঝে অপেক্ষা করতে বলি। এতে ধীরে ধীরে ও অপেক্ষা করতে শিখছে।
দ্বিতীয়ত, চেষ্টা বা পরিশ্রমের মূল্য বোঝানোর চেষ্টা করি। শুধু চাইলেই সব পাওয়া যাবে না, এই ধারণাটা শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কখনো ছোট লক্ষ্য ঠিক করি, সেটা পূরণ করলে তবেই কিছু পাওয়া বা নতুন কিছু করার সুযোগ আসে।
তৃতীয়ত, ছোট ছোট দায়িত্ব দিই। নিজের খেলনা গুছানো, বই ঠিক জায়গায় রাখা, টেবিলে ছোট সাহায্য করা, এসব কাজ শিশুকে শেখায় যে সবাই মিলে পরিবারের কাজ চলে।
আরেকটা বিষয় আমি এখন খুব গুরুত্ব দিই, “কৃতজ্ঞতা চর্চা”।
আমি খেয়াল করেছি, যে পরিবেশে অনেক কিছু সহজে পাওয়া যায়, সেখানে শিশুরা অনেক সময় জিনিসের মূল্য কম বুঝতে শুরু করে। তাই মাঝে মাঝে ওর সাথে এমন কথা বলি, যেখানে “না পাওয়া জিনিস” নয়, বরং “যা আছে” সেটার দিকে মনোযোগ যায়।
যেমন—
“আজকে কোন জিনিসটার জন্য তুমি খুশি ছিলে?”
“আজকের সবচেয়ে ভালো মুহূর্তটা কী ছিল?”
এই ছোট কথাগুলো ধীরে ধীরে কৃতজ্ঞতার মানসিকতা তৈরি করে।
আরেকটা বিষয় আমি শিখেছি, শিশুকে সবসময় পরিবারের কেন্দ্র বানিয়ে ফেলা ঠিক না।
অনেক সময় আমরা বাবা-মা শিশুর সুবিধার জন্য পুরো রুটিন বদলে ফেলি। কিন্তু বাস্তব জীবনে সবাই সবসময় তার ইচ্ছামতো চলবে না। তাই ভাগাভাগি, অপেক্ষা করা, আর মানিয়ে নেওয়া শেখাও খুব গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা।
তবে এর মানে এই না যে শিশুকে ভালোবাসা বা আবেগ কমাতে হবে।
আসলে, যে শিশু আবেগগতভাবে নিরাপদ বোধ করে, সে-ই নিয়ম বা সীমা ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে। সে “না” শুনলেও সেটা ভালোবাসার অভাব হিসেবে নেয় না।
আমাদের অনেক বাবা-মায়েরই নিজের শৈশবের অভাব পূরণ করার একটা প্রবণতা থাকে। আমিও এর বাইরে না। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝেছি, শিশুকে সবকিছু দিয়ে দেওয়া না, বরং ভারসাম্য শেখানোই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে উপকারী। কারণ বাস্তব জীবন সবসময় তার ইচ্ছামতো চলবে না।
তাই ছোটবেলা থেকেই ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, সহানুভূতি আর সীমারেখা বোঝার মতো মানসিকতা তৈরি করাই হয়তো একজন শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন