
আমার মেয়ের বয়স এখন পাঁচ। আর সত্যি বলতে, ওর দৈনন্দিন রুটিন কখনো কখনো আমার নিজের ছোটবেলার পুরো সপ্তাহের রুটিনের থেকেও বেশি গোছানো মনে হয়। স্কুল, আর্ট ক্লাস, ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ, ইংরেজি চর্চা, ইত্যাদি সব মিলিয়ে ওর সময় প্রায় পুরোটা আগেই ভাগ করা থাকে।
একসময় এটা নিয়েই আমি খুব খুশি ছিলাম। মনে হতো, “বাচ্চা নতুন নতুন জিনিস শিখছে, সময় নষ্ট হচ্ছে না।”
কিন্তু কিছুদিন আগে একটা ছোট ঘটনা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছিল।
একদিন কোনো কারণবশত হঠাৎ ওর আর্ট ক্লাস বন্ধ ছিল। খুব ছোট একটা পরিবর্তন, কিন্তু মেয়েটা অস্বাভাবিকভাবে অস্থির হয়ে গেল। বারবার জিজ্ঞেস করছিল, “এখন কী করব?” তখন হঠাৎ মনে হলো, আমরা কি শিশুদের জীবন এত বেশি নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলছি যে তারা হঠাৎ পরিবর্তন আসলে কিভাবে তা সামলাতে হয় বুঝতে পারে না?
আজকাল শহরের অনেক পরিবারেই একটা অদৃশ্য চাপ কাজ করে। আমরা চাই আমাদের সন্তান ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা, ভাষা, খেলাধুলাসহ সব জায়গায় এগিয়ে থাকুক। ফলে অনেক সময় বুঝতে না পেরেই তাদের পুরো শৈশবটাই নির্দিষ্ট সময়সূচির মধ্যে আটকে ফেলি।
কিন্তু শিশু মনোবিজ্ঞান বলছে, শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য শুধু নিয়মিত শেখা নয়, অবাধ খেলাধুলা আর ফাঁকা সময়ও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এই ফাঁকা সময়েই শিশুর কল্পনাশক্তি, নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আর মানসিক নমনীয়তা গড়ে ওঠে।
যখন একটা শিশুর প্রতিটা ঘণ্টা আগে থেকেই ঠিক করা থাকে, তখন সে ধীরে ধীরে সবকিছু নির্দিষ্ট নিয়মে চলবে, এমনটা আশা করতে শুরু করে। ফলে হঠাৎ কোনো পরিকল্পনা বদলে গেলে বা অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে সে সহজে মানিয়ে নিতে পারে না।
আমি নিজের মেয়ের মধ্যেও এটা মাঝে মাঝে দেখি। কোনো পরিকল্পনা বদলে গেলে ও খুব দ্রুত বিরক্ত বা অস্থির হয়ে যায়। আগে ভাবতাম এটা শুধু অভ্যাসের ব্যাপার। কিন্তু পরে বুঝলাম, পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়াও শেখাতে হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বড় হওয়া কিছু শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, সবকিছু নিখুঁত চাওয়ার প্রবণতা কিংবা সামান্য পরিবর্তনেও মানসিক চাপ বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয় দেখা দিতে পারে।
অবশ্যই নিয়ম মেনে চলা খারাপ কিছু না। বরং নির্দিষ্ট রুটিন শিশুকে নিরাপত্তা দেয়, শৃঙ্খলা শেখায় এবং পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা তৈরি করে। কিন্তু সমস্যা তখন হয়, যখন জীবনে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততার কোনো জায়গাই থাকে না।
আমাদের অনেক মা-বাবার মধ্যেই একটা ভয় কাজ করে, “আমার সন্তান পিছিয়ে পড়বে না তো?” এই ভয় থেকেই আমরা অনেক সময় শিশুর প্রতিটা মুহূর্ত “উপকারী” করে তুলতে চাই। কিন্তু আমরা এটা বুঝতে পারি না যে শিশুর মস্তিষ্ক সবসময় কাজ আর শেখার চাপে থাকার জন্য তৈরি না। অনেক সময় উদ্দেশ্যহীন খেলাধুলাও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তাই এখন আমি চেষ্টা করি সপ্তাহে কিছু সময় পুরোপুরি ফাঁকা রাখার। যেখানে ও নিজের মতো খেলবে, বিরক্ত হবে, গল্প বানাবে বা নতুন কিছু ভাববে। শুরুতে আমার নিজের কাছেই এটা অস্বস্তিকর লাগত। মনে হতো, “সময় নষ্ট হচ্ছে না তো?” কিন্তু পরে দেখলাম, এই ফাঁকা সময়গুলোতেই ও সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল হয়ে ওঠে। কখনো নিজের খেলনা নিয়ে নতুন গল্প বানাচ্ছে, কখনো একা একা নতুন খেলা তৈরি করছে।
আমি এখন ভারসাম্যপূর্ণ ভাবনায় বিশ্বাস করি। শিশুকে শুধু ব্যস্ত রাখাই তার জন্য উপকারী নয়। বরং কখনো কখনো শিশুকে তার নিজের মতো করে পৃথিবী আবিষ্কার করার সুযোগ দেয়াও প্রয়োজন। কারণ খুব বেশি নিয়মে বাঁধা শৈশব বাইরে থেকে গোছানো আর পারফেক্ট মনে হলেও, জীবনের ছোট ছোট পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিয়ে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারাটাই আসলে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন