
মা হওয়ার আগে আমি ভাবতাম, বাচ্চা ঘুমালে শুধু শরীর বিশ্রাম পায়। কিন্তু সন্তান হওয়ার পর বুঝেছি, ছোট শিশুর জন্য ঘুম শুধু বিশ্রাম না, এটা তার মেজাজ, আচরণ, শেখার ক্ষমতা, এমনকি আবেগ নিয়ন্ত্রণের-এর সাথেও গভীরভাবে জড়িত। আমার ছেলে যখন ছোট ছিল, তখন একটা জিনিস প্রায়ই খেয়াল করতাম। যেদিন দুপুরে ঠিকমতো ঘুম হতো না, সেদিন সন্ধ্যার পর থেকেই ওর আচরণ পুরো বদলে যেত। সামান্য কথায় কান্না, বেশি রাগ, খেতে না চাওয়া, কোলে লেগে থাকা, সব একসাথে শুরু হতো।
শুরুতে আমি ভাবতাম হয়তো ও অতিরিক্ত জেদ করছে। পরে শিশুদের ঘুম সংক্রান্ত আচরণ নিয়ে পড়তে গিয়ে বুঝলাম, ঘুম কম হলে ছোট শিশুর মস্তিষ্ক আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট পায়।
বিশেষ করে ০–৫ বছর বয়সে শিশুর ব্রেইন খুব দ্রুত ডেভেলপ করে। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক স্মৃতি সংরক্ষণ করে, আবেগের ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরের বৃদ্ধি ও বিকাশে প্রয়োজনীয় গ্রোথ হরমোন বেশি কাজ করে। তাই ঘুম কম হলে শুধু ক্লান্তি না, আচরণেও পরিবর্তন দেখা যায়।
অনেক বাবা-মা একটা জিনিস ভুল বোঝেন যে বাচ্চার ঘুম কম হলে নিশ্চয় শান্ত বা দুর্বল দেখাবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশু উল্টো অতিরিক্ত অস্থির ও চঞ্চল হয়ে যায়।
আমার ছেলের ক্ষেত্রেও এটা হয়েছে। রাতে দেরিতে ঘুমালে পরদিন ও বেশি দৌড়াদৌড়ি করত, কিন্তু খুব অল্পতেই রেগে যেত। পরে জানতে পারি, অতিরিক্ত ক্লান্ত শিশুরা অনেক সময় অতিরিক্ত অ্যাকটিভ আচরণও দেখায়। কারণ তাদের স্নায়ুতন্ত্র (nervous system) তখন অতিরিক্ত উত্তেজিত ও চাপগ্রস্ত অবস্থায় থাকে।
আরেকটা বড় সমস্যা হলো মনযোগ কমে যাওয়া।
ঘুম কম হলে শিশুর কনসেনট্রেশন (Concentration) কমে যেতে পারে। খেলনায় মন না বসা, একই জিনিস বারবার ফেলে দেওয়া, ইনস্ট্রাকশনস (Instructions) না শোনা, এসবও দেখা যায়। অনেক সময় বাবা-মা ভাবেন বাচ্চা “অতিরিক্ত দুষ্ট” হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে শরীর এবং মস্তিষ্ক দুটোই ক্লান্ত থাকে।
আমার নিজের একটা ভুল ছিল রাতে দেরি করে পরিবারের সবাই মিলে টিভি দেখা। তখন ছেলে স্বাভাবিকভাবেই জেগে থাকত। পরে বুঝেছি, ঘুমানোর আগের রুটিন ছোট শিশুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এখন আমরা চেষ্টা করি রাতে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইট একটু কমিয়ে শান্ত পরিবেশ তৈরি করতে। ঘুমানোর আগে মোবাইল বা টিভি বন্ধ রাখি। কারণ স্ক্রিন-এর ব্লু লাইট মেলাটোনিন (Melatonin) নামের স্লিপ হরমোন (Sleep Hormone) এর কাজ ব্যাহত করতে পারে। এতে শিশুর ঘুম আসতে দেরি হয়।
আরেকটা জিনিস আমি খেয়াল করেছি, ঘুম কম হলে ইমোশনাল মেল্টডাউন (Emotional Meltdown) অনেক বাড়ে। যেদিন ঘুম কম হয়, সেদিন ছোট ছোট বিষয়েও ছেলে কান্না শুরু করে। আগে আমি রাগ করতাম। এখন আগে ভাবি, “আজ ও ঠিকমতো ঘুমাতে পেরেছে তো?”
বিজ্ঞান অনুযায়ী, ঘুমের ঘাটতি (sleep deprivation) ছোট শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে হতাশা বা বিরক্তিকর পরিস্থিতি সহ্য করার ক্ষমতাও কমে যায়। তাই ছোটখাটো বিষয়েও তারা তুলনামূলক বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
খাবারের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। ঘুম কম হলে অনেক শিশুর ক্ষুধার ধরন (appetite) পরিবর্তন হয়। কেউ কম খায়, আবার কেউ বারবার স্ন্যাকস খেতে চায়। কারণ ঘুম শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের সাথেও সম্পর্কিত।
আমার ছোট মেয়ের ক্ষেত্রেও এখন এটা বুঝতে পারি। ওর দিনের ঘুম (nap) ঠিকমতো না হলে সন্ধ্যার পর খুব অস্থির হয়ে যায়।
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব শিশুর ঘুমের চাহিদা এক নয়।
সাধারণভাবে:
• ১–২ বছরের শিশুর প্রায় ১১–১৪ ঘণ্টা ঘুম দরকার
• ৩–৫ বছরের শিশুর প্রায় ১০–১৩ ঘণ্টা ঘুম দরকার (napসহ)
তবে প্রতিটি শিশুর প্যাটার্ন একটু আলাদা হতে পারে।
আমি এখন পারফেক্ট রুটিন মেইনটেইন (Perfect Routine Maintain) করতে পারি না সবসময়। কখনো অতিথি আসে, কখনো বাসার কাজের চাপ থাকে। কিন্তু অন্তত একটা জিনিস বুঝেছি, শিশুর আচরণ খারাপ হলেই শুধু “জেদ” ভাবা ঠিক না।
অনেক সময় তার ছোট্ট ব্রেইন শুধু বিশ্রাম চায়।
এখন আমি ছেলের আচরণ খারাপ দেখলে আগে ভাবি:
• ও ঠিকমতো ঘুমিয়েছে?
• অনেক বেশি স্ক্রিন টাইম হয়েছে?
• আজ ও ওভারস্টিমুলেটেড (Overstimulated) ছিল?
কারণ ছোট শিশুরা অনেক সময় কথায় বলতে পারে না যে তারা ক্লান্ত। তারা সেটা আচরণ দিয়ে প্রকাশ করে।
আমরা বড়রা যেমন ক্লান্ত হলে বিরক্ত হই, শিশুরাও হয়। পার্থক্য শুধু তারা সেটা কন্ট্রোল করতে পারে না। আর তাই অনেক সময় একটু বেশি ঘুম, একটু শান্ত পরিবেশ আর একটু ধৈর্য, এই তিনটাই শিশুর আচরণ বদলে দিতে পারে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন