লোগো

বড় সন্তানের উপর ছোট ভাইবোনের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া / বড় বোনকে “দ্বিতীয় মা” বানানো কি ঠিক?

বড় সন্তানের উপর ছোট ভাইবোনের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া / বড় বোনকে “দ্বিতীয় মা” বানানো কি ঠিক?

ফাহমিদা বেগমের বড় মেয়েটার বয়স মাত্র ৯ বছর। কিন্তু অনেক সময় তাকে দেখে মনে হয় সে যেন এই বাসার আরেকজন ছোট মা। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে ছোট ভাইকে খাওয়ানো, বিকেলে তাকে ঘুম পাড়ানো, মা কাজে গেলে নজর রাখা; এসব এখন তার দৈনন্দিন কাজের অংশ। ফাহমিদা নিজেও বুঝতে পারেন, মেয়েটার ওপর দায়িত্ব একটু বেশিই পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু উপায়ও যেন খুব বেশি নেই। গার্মেন্টসের চাকরি, সংসারের কাজ, স্বামীর অনিয়মিত আয়, সব মিলিয়ে বড় মেয়েটার সাহায্য ছাড়া অনেক সময় সংসার সামলানো কঠিন হয়ে যায়।

বাংলাদেশের অনেক নিম্নআয়ের বা কর্মজীবী পরিবারে এই দৃশ্য খুব পরিচিত। বিশেষ করে বড় মেয়েরা খুব ছোট বয়স থেকেই “দায়িত্বশীল” হয়ে যায়। বাইরে থেকে এটা অনেক সময় ভালো গুণ মনে হলেও, child psychology বলছে, অতিরিক্ত পরিচর্যার দায়িত্ব শিশুর মানসিক বিকাশের ওপর চাপ ফেলতে পারে।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
ঘরের ছোটখাটো কাজে সাহায্য করা এক জিনিস, আর শিশুকে নিয়মিত অভিবাবক-এর ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করা আরেক জিনিস।
মনোবিজ্ঞানে এর একটা পরিচিত ধারণা আছে— parentification। অর্থাৎ, যখন একটি শিশু বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে শুরু করে।
যেমন—
●    ছোট ভাইবোনকে নিয়মিত সামলানো
●    নিজের পড়াশোনার চেয়ে ভাই-বোনের যত্ন করাকে প্রাধান্য দিতে বাধ্য হওয়া
●    মা-বাবার আবেগীয় চাপ সহ্য করা
●    “তুই বড়, তোকে বুঝতে হবে” শুনতে শুনতে নিজের শৈশব চাপা পড়ে যাওয়া
ফাহমিদার বড় মেয়েটা একদিন স্কুলে যেতে চাইছিল না। কারণ ছোট ভাই জ্বর নিয়ে কাঁদছিল। সে বলেছিল,
“আমি গেলে ভাইয়াকে কে দেখবে?”
এই কথাটা শুনে ফাহমিদার বুকটা হঠাৎ কেমন করে উঠেছিল। কারণ ৯ বছরের একটা শিশুর মাথায় এমন চিন্তা থাকার কথা না।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত গৃহস্থালি দায়িত্ব শিশুদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা (empathy) গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত যত্নদায়িত্ব (caregiving burden) শিশুর মধ্যে চাপ, উদ্বেগ এবং আবেগগত ক্লান্তি বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে বড় বোনদের ক্ষেত্রে সমাজ অনেক সময় অজান্তেই “ছোট মা” বানিয়ে ফেলে।
“তুই মেয়ে মানুষ, শিখে রাখ।”
“তুই বড় আপা, তোকে সামলাতে হবে।”
“মা নাই, এখন তুই দেখ।”
এই কথাগুলো শুনতে সাধারণ মনে হলেও, দীর্ঘদিন ধরে এগুলো শিশুর নিজের identity-র ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক বড় সন্তান পরে নিজের প্রয়োজন, ইচ্ছা বা childhood emotion express করতেই অস্বস্তি বোধ করে। কারণ সে ছোটবেলা থেকেই “নিজের চেয়ে অন্যদের আগে” ভাবতে শিখেছে।
ফাহমিদার বড় মেয়েটাও মাঝে মাঝে খেলতে যেতে চায়। কিন্তু ছোট ভাইকে রেখে বের হলে তার দাদি বলেন,
“তুই না থাকলে ওরে কে সামলাবে?”
ফলে মেয়েটা ধীরে ধীরে guilt feel করতে শুরু করে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুকে occasional help করতে বলা ঠিক আছে। যেমন—
●    ভাইকে পানি দেওয়া
●    একসাথে খেলানো
●    ছোটখাটো কাজে সাহায্য করা
এগুলো sibling bonding বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে।
কিন্তু যদি শিশুর নিজের পড়াশোনা, বিশ্রাম, খেলা বা তার আবেগীয় প্রয়োজন নিয়মিত sacrifice করতে হয়, তখন সেটা unhealthy হয়ে যেতে পারে।
আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ— বড় সন্তান “দায়িত্ব নেয়” মানেই সে emotionally okay আছে, এমন না।
অনেক শিশুই quiet maturity develop করে। বাইরে থেকে খুব বুঝদার মনে হয়, কিন্তু ভেতরে চাপ জমতে থাকে।
ফাহমিদা পরে একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। এখন তিনি বড় মেয়েকে মাঝে মাঝে স্পষ্ট করে বলেন,
“তুই আমার সাহায্য করিস, কিন্তু তুই এখনও বাচ্চা।”
এই কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুরা অনেক সময় দায়িত্ব নিতে নিতে নিজের “childhood permission” হারিয়ে ফেলে।
তিনি এখন চেষ্টা করেন মেয়েটার নিজের সময়ও থাকুক। কখনো পাশের বান্ধবীর সাথে খেলতে পাঠান, কখনো শুধু আঁকাআঁকি করতে দেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, মুক্ত খেলা (free play) এবং সমবয়সীদের সঙ্গে মেলামেশা (peer interaction) শিশুর আবেগগত বিকাশে (emotional development) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধুমাত্র যত্নদানের ভূমিকায় (caregiving role) সীমাবদ্ধ থাকলে শিশুর নিজের আবেগগত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। অনেক পরিবারে বড় সন্তানদের সাহায্য ছাড়া সংসার চালানো সত্যিই কঠিন। তাই এখানে perfect parenting-এর চেয়ে balance বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ—
✔ সাহায্য চাইতে পারেন
✔ দায়িত্ব ভাগ করতে পারেন
✔ sibling care শেখাতে পারেন
কিন্তু একইসাথে মনে রাখতে হবে—
✔ বড় সন্তান parent না
✔ তারও খেলাধুলা, বিশ্রাম, মন খারাপ আর শৈশবের অধিকার আছে
✔ “বড়” মানেই emotionally ready না
কারণ একটি শিশু যদি খুব দ্রুত বড় হয়ে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে অনেক সময় তার শৈশবটা চুপচাপ হারিয়ে যায়।
 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000