লোগো

বাবা-মায়ের সম্পর্ক কি সত্যিই শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রভাব ফেলে?

বাবা-মায়ের সম্পর্ক কি সত্যিই শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রভাব ফেলে?

আমি আগে ভাবতাম, সন্তান মানুষ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাকে ভালো স্কুলে পড়ানো, ঠিকমতো খাওয়ানো আর ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমানো। কিন্তু বাবা হওয়ার পর ধীরে ধীরে একটা বিষয় বুঝতে শুরু করেছি, শিশুরা শুধু আমাদের কথা শুনে বড় হয় না, তারা আমাদের সম্পর্ক “দেখে” বড় হয়।

আমি একজন চাকরিজীবী মানুষ। অফিসের চাপ, সংসারের হিসাব, যৌথ পরিবারের দায়িত্ব, সব মিলিয়ে অনেক সময় মানসিক চাপ থাকে। এমন দিনও গেছে যখন ক্লান্তি থেকে স্ত্রীর সাথে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তর্ক হয়েছে। আগে ভাবতাম, “বাচ্চারা তো ছোট, কিছু বুঝবে না।” কিন্তু পরে বুঝলাম, তারা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বুঝে।
আমার চার বছরের ছেলে একদিন আমি আর ওর মায়ের একটু উঁচু গলায় কথা বলার পর চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। পরে এসে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা রাগ করছো?” তখন বুঝলাম, শিশুরা শুধু শব্দ না, বাসার আবেগী পরিবেশও অনুভব করে।
মনোবিজ্ঞান ও শিশু বিকাশবিষয়ক গবেষণা বহুদিন ধরেই বলে আসছে, বাবা-মায়ের সম্পর্ক শিশুর ব্যক্তিত্ব, মানসিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সম্পর্কের ধরণ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
আমরা অনেক সময় শিশুদের শিখাই,
● ভদ্রভাবে কথা বলতে
● রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে
● অন্যকে সম্মান করতে
কিন্তু বাস্তবে তারা সবচেয়ে বেশি শেখে আমাদের আচরণ দেখে।
আমি যদি সবসময় রাগ করে কথা বলি, অসম্মানজনক ভঙ্গিতে কথা বলি, তাহলে শিশুও সেটাকে স্বাভাবিক যোগাযোগের ধরন মনে করতে পারে।
আবার উল্টোভাবে, যদি সে দেখে,
● বাবা-মা একে অপরকে সম্মান করছে
● মতভেদ হলেও শান্তভাবে কথা বলছে
● ভুল হলে “দুঃখিত” বলছে
তাহলে শিশুর মধ্যেও স্বাস্থ্যকর যোগাযোগের দক্ষতা তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে পর্যবেক্ষণভিত্তিক শিক্ষা বলেন। অর্থাৎ শিশু আশেপাশের সম্পর্ক দেখে নিজের আচরণ ও ব্যক্তিত্বের ভিত্তি তৈরি করে।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোনো পরিবারই নিখুঁত না। আমাদের বাসাতেও মতের অমিল হয়। সেটা স্বাভাবিক। সমস্যা আসলে মতভেদ না, সমস্যা হলো মতভেদ কীভাবে সামলানো হচ্ছে।
যদি শিশুর সামনে,
● চিৎকার
● অপমান
● কথা বন্ধ করে রাখা
● আক্রমণাত্মক আচরণ
নিয়মিত ঘটে, তাহলে সেটা শিশুর মানসিক বিকাশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি বাবা-মায়ের দ্বন্দ্ব শিশুদের উদ্বেগ, অনিরাপত্তা এবং আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আমি নিজেও এটা বুঝেছি। যেদিন বাসার পরিবেশ উত্তেজনাপূর্ণ থাকে, সেদিন বাচ্চারাও বেশি বিরক্ত বা অস্থির হয়ে যায়।
শিশুর ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হলো মানসিক নিরাপত্তা। যখন শিশু দেখে তার বাবা-মায়ের সম্পর্ক স্থিতিশীল ও যত্নশীল, তখন সে পৃথিবীকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করে।
এতে তার মধ্যে,
● আত্মবিশ্বাস
● সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য
● মানসিক স্থিতিশীলতা
বাড়তে সাহায্য করে।
অন্যদিকে যদি শিশুর মনে সবসময় দুশ্চিন্তা থাকে, “আজকে বাসায় ঝগড়া হবে না তো?” তাহলে সে মানসিকভাবে গুটিয়ে যেতে পারে বা অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুরা অনেক সময় নিজেদেরই এসব সমস্যার জন্য দায়ী মনে করতে শুরু করে।
আমাদের দেশে অনেক পরিবারে বাবা-মায়ের ভালোবাসা প্রকাশ্যে দেখানো কম হয়। বিশেষ করে বড়দের সামনে তো আরও কম। আমিও আগে এসব নিয়ে খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। কিন্তু পরে বুঝেছি, শিশুর সামনে স্বাস্থ্যকর ভালোবাসা প্রকাশ করা খারাপ কিছু না।
যেমনঃ
● সম্মান দিয়ে কথা বলা
● একে অপরকে সাহায্য করা
● কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
এসব দেখে শিশুর মনে একটি ভালো ও সুন্দর সম্পর্কের ধারণা তৈরি হয়।
আমাদের মতো যৌথ পরিবারে সম্পর্ক বজায় রাখা কখনো কখনো কঠিন হয়।
কারণ,
● ব্যক্তিগত সময় কম থাকে
● আর্থিক চাপ বেশি থাকে
● অনেকের মতামত থাকে
অনেক সময় এই চাপ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের উপরও পড়ে।
আমি আগে ভাবতাম শুধু উপার্জন করাই বাবার মূল দায়িত্ব। কিন্তু এখন বুঝি, মানসিকভাবে উপস্থিত থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুরা শুধু “বাবা সংসার চালায়” এটা দেখে না। তারা দেখে বাবা মায়ের সাথে কেমন আচরণ করছে। 
আমি নিখুঁত না। এখনো রাগ হয়, ধৈর্য হারাই। কিন্তু একটা জিনিস সচেতনভাবে চেষ্টা করি, সম্পর্ক মেরামত করা। যদি কখনো বাচ্চাদের সামনে তর্ক হয়, পরে চেষ্টা করি স্বাভাবিক যোগাযোগ ফিরিয়ে আনতে। কারণ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মতভেদের পর সম্পর্ক ঠিক করার প্রক্রিয়া দেখা শিশুর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এতে তারা শেখেঃ
● মতভেদ হওয়া স্বাভাবিক
● কিন্তু সম্পর্ক ঠিক করাও গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের সমাজে এখনো অনেক জায়গায় সন্তান লালন-পালন পুরোপুরি মায়ের দায়িত্ব মনে করা হয়। কিন্তু গবেষণা বলছে, বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমি এখন চেষ্টা করি
● বাচ্চাদের সাথে কথা বলতে
● স্ত্রীর কাজের চাপ বুঝতে
● পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখতে
সবসময় পারি না, কিন্তু চেষ্টা করি।
আমি এখন বুঝি, শিশুদের ব্যক্তিত্ব শুধু বংশগত বৈশিষ্ট্য দিয়ে তৈরি হয় না। তারা যে পরিবেশে বড় হয়, সেটাও তাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
আমরা বাবা-মা হিসেবে নিখুঁত হবো না, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু শিশুরা যদি দেখে
● সম্মান আছে
● নিরাপত্তা আছে
● ভালোবাসা আছে
● ভুল হলেও সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা আছে
তাহলে সেটাই তাদের ব্যক্তিত্বের ভিত শক্ত করতে সাহায্য করে। কারণ শিশুরা শুধু আমাদের কথাগুলো মনে রাখে না, তারা মনে রাখে আমরা একে অপরের সাথে কেমন আচরণ করতাম।
 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000