লোগো

শরীরচর্চামূলক খেলাধুলা

শরীরচর্চামূলক খেলাধুলা

শাহ আলমের ছেলে রাফির বয়স তিন বছর। ছোট্ট বাসা, চারপাশে ব্যস্ত রাস্তা, খেলাধুলার জন্য বড় মাঠও খুব একটা নেই। তাই বেশিরভাগ সময় রাফি বাসার ভেতরেই থাকে। কখনো মায়ের মোবাইলে ভিডিও দেখে, কখনো ছোট গাড়ি নিয়ে খেলে। কিন্তু রাফি খুব দ্রুত বিরক্ত হয়ে যায়, রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে চায় না, আবার ছোট্ট কিছুতেই রেগে যায় বিষয়গুলো এক সময় শাহ আলম খেয়াল করতে শুরু করেছিল। একদিন পাশের এলাকার এক স্বাস্থ্যকর্মী তাকে বললেন, “বাচ্চাদের শরীরচর্চামূলক খেলাধুলা খুব দরকার।” প্রথমে শাহ আলম ভাবল, “এই ছোট্ট বাচ্চা আবার কী শরীরচর্চা করবে?” আসলে ছোট শিশুদের জন্য শরীরচর্চা মানে জিম বা ব্যায়াম না। দৌড়ানো, লাফানো, বল গড়ানো, হাত-পা নেড়ে খেলা, এসবই তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শরীরচর্চামূলক খেলাধুলা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, ছোট শিশুদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত নড়াচড়া ও সক্রিয় খেলাধুলা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খুব জরুরি। কারণ এই বয়সে শিশুর শরীর ও মস্তিষ্ক খুব দ্রুত বিকাশ লাভ করে।
যখন শিশু দৌড়ায়, লাফায় বা খেলতে খেলতে শরীর নড়াচড়া করে, তখন তার মাংসপেশি, হাড় ও শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা উন্নত হয়। একইসাথে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশও সক্রিয় হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শরীরচর্চামূলক খেলাধুলা শিশুর gross motor skill বাড়াতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, শরীরের বড় বড় নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তৈরি হয়।
যেমন—
•    দৌড়ানো 
•    লাফ দেয়া 
•    বল ধরা 
•    সিঁড়ি ওঠা 
•    ভারসাম্য রাখা 
এসব কাজ শিশুর শরীরকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়।
শাহ আলম এখন মাঝে মাঝে রাফিকে নিয়ে কাছের মাঠে যায়। বড় মাঠ না হলেও একটু খোলা জায়গা আছে। সেখানে রাফি দৌড়ায়, বল ছোড়ে, মাঝে মাঝে পড়ে যায় আবার উঠে দাঁড়ায়।
আগে সে ভাবত পড়ে গেলে খেলা বন্ধ করা উচিত। এখন বুঝতে পারে, নিরাপদ সীমার মধ্যে ছোটখাটো পড়ে যাওয়া বা চেষ্টা করা শিশুর শেখারই অংশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শারীরিক খেলাধুলা শিশুদের মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। কারণ শরীর নড়াচড়া করলে ব্রেইন-এ এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয় যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে।
অনেক শিশু সারাদিন ঘরের মধ্যে মোবাইল বা টিভির সামনে থাকলে অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা বা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই স্ক্রিন টাইম কমিয়ে শরীরচর্চামূলক খেলাধুলা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
শাহ আলম এখন চেষ্টা করে সন্ধ্যার পর অন্তত কিছু সময় রাফিকে বাইরে হাঁটাতে বা খেলাতে। এতে রাফি রাতে একটু ভালো ঘুমায়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরীরচর্চামূলক খেলাধুলা শুধু শরীরের জন্য না, সামাজিক শেখার জন্যও ভালো।
যখন শিশু অন্যদের সাথে বল খেলতে শেখে, পালা মেনে খেলতে শেখে বা পড়ে গিয়ে আবার চেষ্টা করে, তখন তার সামাজিক দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও বাড়ে।
নিম্ন আয়ের পরিবারে অনেক সময় খেলাধুলার জন্য আলাদা খেলনা বা বড় জায়গা থাকে না। কিন্তু তাতেও সমস্যা নেই।
যেমন—
•    পুরোনো কাপড় দিয়ে বল বানানো 
•    দৌড় প্রতিযোগিতা করা 
•    লুকোচুরি খেলা 
এসব সাধারণ খেলাও শিশুর শরীরচর্চার অংশ হতে পারে।
তবে নিরাপত্তার বিষয়টা খেয়াল রাখা জরুরি। খুব ব্যস্ত রাস্তার পাশে বা বিপজ্জনক জায়গায় শিশুকে খেলতে দেয়া ঠিক না। খেলাধুলার সময় বড়দের নজর থাকাও দরকার।
শাহ আলম এখন বুঝেছে, শিশুর ভালো শৈশব মানে শুধু খাওয়ানো বা স্কুলে পাঠানো না। তার শরীরটাও যেন সুস্থভাবে বড় হতে পারে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
হয়তো তাদের জীবনে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু প্রতিদিন একটু দৌড়ঝাঁপ, একটু হাসি, একটু খেলাধুলা, এগুলোই রাফির শৈশবকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে।
কারণ একটা শিশু যখন আনন্দ নিয়ে শরীর নড়াচড়া করে, তখন শুধু তার শরীর না বরং তার মন আর আত্মবিশ্বাসও ধীরে ধীরে শক্ত হতে শুরু করে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000