
শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হচ্ছে আত্মপরিচয় (Self-Identity) ও আত্মসম্মান (Self-Esteem) । আত্মপরিচয় বলতে বোঝায় একটি শিশু ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—সে কে, তার কী কী গুণ আছে, সে কী করতে পারে এবং কোন কাজগুলো করতে তার ভালো লাগে।
শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হচ্ছে আত্মপরিচয় (Self-Identity) ও আত্মসম্মান (Self-Esteem) । আত্মপরিচয় বলতে বোঝায় একটি শিশু ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—সে কে, তার কী কী গুণ আছে, সে কী করতে পারে এবং কোন কাজগুলো করতে তার ভালো লাগে। আর আত্মসম্মান হলো নিজের প্রতি সম্মান, নিজের মূল্য বোঝা এবং নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস রাখা। মূলত শৈশবেই একটি শিশুর এই দুটি গুণের ভিত্তি তৈরি হয় এবং এরই মধ্যদিয়ে শিশুর ভবিষ্যৎ মানসিক বিকাশও সুস্থভাবে এগিয়ে যায়। এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী Erik Erikson তার Childhood and Society (1950) বইয়ে বলেন, একটি শিশুর মানসিক বিকাশ শুধু বয়স বাড়ার সাথে নয়, বরং তার আশেপাশের মানুষ ও পরিবেশের অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। পরিবার, বাবা-মা এবং আশেপাশের মানুষের ভালোবাসা, উৎসাহ ও আচরণ শিশুর আত্মবিশ্বাস, আচরণ এবং আত্মপরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন একটি শিশু নতুন কিছু শেখে, খেলাধুলা করে, প্রশ্ন করে এবং অন্যদের সাথে মিশে, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে শুরু করে। এই ধারণাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় Self-Concept (আত্মধারণা) বলা হয়। শিশুকে যদি বারবার বলা হয় যে সে কিছুই পারে না বা অন্যদের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে তার এই আত্মধারণা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাকে যদি উৎসাহ দেওয়া হয় এবং তার ছোট ছোট সাফল্যকে মূল্য দেওয়া হয়, তাহলে সে নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে শেখে।
শিশুর এই আত্মপরিচয়ের উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় আত্মসম্মান। সমাজবিজ্ঞানী Morris Rosenberg তার Society and the Adolescent Self-Image (1965) বইয়ে দেখিয়েছেন যে একজন মানুষের আত্মসম্মান তার চিন্তা, আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যেসব শিশু নিজেদেরকে মূল্যবান মনে করে এবং নিজের উপর বিশ্বাস রাখে, তারা সাধারণত বেশি আত্মবিশ্বাসী হয় এবং নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে সাহস পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু নিয়মিত উৎসাহ পায় এবং তাদের প্রচেষ্টাকে প্রশংসা করা হয়, তাদের আত্মসম্মান তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। তাই বড়দের উচিত শিশুদের সাথে সম্মানজনক আচরণ করা, তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া।
শিশুর আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মান গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিশুকে নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। যখন একটি শিশু তার মনের কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারে এবং দেখে যে বড়রা তা গুরুত্ব দিয়ে শুনছে, তখন সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শেখে। দ্বিতীয়ত, শুধু ফলাফল নয়, বরং শিশুর চেষ্টাকে প্রশংসা করা প্রয়োজন। মনোবিজ্ঞানী Carol Dweck তার বিখ্যাত বই “Mindset: The New Psychology of Success” (2006)-এ দেখিয়েছেন যে যখন শিশুদের চেষ্টা ও পরিশ্রমকে প্রশংসা করা হয়, তখন তাদের মধ্যে Growth Mindset তৈরি হয়। এতে তারা মনে করে যে চেষ্টা করলে তারা আরও ভালো করতে পারবে। তৃতীয়ত, শিশুকে ছোট ছোট দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, যেমন নিজের খেলনা গুছানো বা বই ঠিক জায়গায় রাখা। এতে শিশু মনে করে যে সে কিছু করতে সক্ষম এবং ধীরে ধীরে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। চতুর্থত, অন্য শিশুদের সাথে তুলনা করা থেকে বিরত থাকা জরুরি, কারণ তুলনা অনেক সময় শিশুর মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি করে।
বর্তমান সময়ে শিশুদের শেখার একটি বড় মাধ্যম হলো ডিজিটাল কনটেন্ট, বিশেষ করে ইউটিউবের শিক্ষামূলক ভিডিও। তাই আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মান শেখার জন্য শিশুদের একটি বিশেষ মাধ্যম হতে পারে এই ডিজিটাল কনটেন্ট যেখানে ইতিবাচক মূল্যবোধ, ভালো আচরণ, সহযোগিতা, কৃতজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাসের বার্তা থাকে। যেমন—বন্ধুত্ব, পরিবার, ধন্যবাদ বলা, ভুল করলে দুঃখ প্রকাশ করা, নিজের কাজ নিজে করা বা অন্যকে সাহায্য করার মতো বিষয় নিয়ে তৈরি শিক্ষামূলক গল্প ও গান যা শিশুদের এই গুণগুলো শেখাতে সাহায্য করে। তাই অভিভাবকদের উচিত শিশু কী ধরনের ভিডিও দেখছে তা খেয়াল রাখা এবং এমন কনটেন্ট বেছে দেওয়া যা তাদের ইতিবাচক চিন্তা, আত্মবিশ্বাস এবং ভালো আচরণ শেখায়।
আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মান বিষয়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ কন্টেন্ট পেতে AdorshoLipi-এর “সমাজবিজ্ঞান - Society & Emotional Intelligence (আদর্শলিপি)” প্লেলিস্ট এ ক্লিক করুন।
সবশেষে বলা যায়, শিশুর আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মান গড়ে তোলা কোনো একদিনের কাজ নয়; এটি একটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়া। আমাদের শিশুদের যদি ভালোবাসা, সম্মান, উৎসাহ এবং শেখার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে নিজের মূল্য বুঝতে শিখবে। আর যখন একটি শিশু নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে শেখে, তখন সে ভবিষ্যতে আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল এবং ইতিবাচক একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তাই শিশুর মানসিক বিকাশের এই গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করার জন্য আমাদের সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন