
যমজ ছেলে হওয়ার পর আমাদের বাসায় একটা জিনিস খুব কমন হয়ে গিয়েছিল, ইউটিউব রেকমেন্ডেশন। কেউ বলছে “এই ভিডিও দিলে বাচ্চা ABC শিখবে”, কেউ বলছে “এই ছড়া শুনলে বাচ্চা শান্ত থাকে”, আবার কেউ বলছে “আজকালকার বাচ্চারা মোবাইল দিয়েই দ্রুত শেখে।” সত্যি বলতে, আমিও একসময় কৌতূহল থেকে “শিশুদের শিক্ষামূলক ভিডিও” চালিয়ে দেখেছিলাম। উজ্জ্বল রং, আকর্ষণীয় মিউজিক, নড়াচড়া করা শেপস ইত্যাদি দেখে মনে হয় সত্যিই শিক্ষামূলক কিছু। কিন্তু পরে বিষয়টা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে বুঝলাম, ব্যাপারটা আসলে এতটা সহজ না।
প্রথমেই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝলাম, ২ বছরের নিচের শিশুর মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি শেখে বাস্তব মানুষের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন এর মাধ্যমে, স্ক্রিন থেকে না।
American Academy of Pediatrics সহ অনেক শিশু বিষয়ক গবেষণায় বলা হয়, ছোট শিশুর ভাষা বিকাশ, আবেগগত বন্ধন এবং সামাজিক শেখা সবচেয়ে ভালো হয় ফেস-টু-ফেস ইন্টারঅ্যাকশনের মাধ্যমে। অর্থাৎ মা-বাবার মুখ দেখা, কথা শোনা, চোখে চোখ রাখা, প্রতিক্রিয়া পাওয়া, এগুলোই মস্তিষ্ক বিকাশের মূল অংশ।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে শিশুদের শিক্ষামূলক ভিডিও কি পুরোপুরি ক্ষতিকর?
না, সবকিছুই ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট না।
সমস্যা মূলত হয় যখন স্ক্রিন বাস্তব ইন্টারঅ্যাকশনকে রিপ্লেস করতে শুরু করে। আমি নিজেও লক্ষ্য করেছি, অনেক সময় বাবা-মা ক্লান্ত হয়ে স্বাভাবিকভাবেই মোবাইলের সাহায্য নিতে চান। বিশেষ করে ব্যস্ত পরিবারে বা যৌথ পরিবারে সবাই যখন ব্যস্ত থাকে, তখন একটা ভিডিও শিশুকে কিছু সময়ের জন্য শান্ত রাখবে এই ভেবে শিশুকে মোবাইল বা ট্যাব ধরিয়ে দেয়া হয়। যদিও শিশুদের শান্ত করার উদ্দেশ্যে শিশুর হাতে মোবাইল বা ট্যাব ধরিয়ে দেয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
তাছাড়া খুব ছোট শিশুরা স্ক্রিনের কনটেন্ট পুরোপুরি প্রক্রিয়া করতে পারে না যেভাবে বড়রা পারে। এটাকে অনেকে “ভিডিও ডেফিসিট ইফেক্ট” বলেন। অর্থাৎ স্ক্রিনে যা দেখছে, সেটা বাস্তব জীবনের শেখায় রূপান্তর করা শিশু বা টডলারের জন্য কঠিন হয়।
উদাহরণ হিসেবে, ভিডিওতে আপেল দেখে “আপেল” শব্দ শুনলেও, বাস্তবে আপেল হাতে নিয়ে সরাসরি ইন্টারঅ্যাকশনের মতো শেখার প্রভাব হয় না। এক্ষেত্রে একটি শিশুকে বাস্তবে “আপেল” দেখিয়ে শেখানোর পর তাকে দিনের একটি সময়ে যখন ভিডিও দেখতে দেয়া হবে তখন “আপেল” ফল দেখালে তার উপকার হবে কেননা সে তখন বাস্তবের আপেল এর সাথে স্ক্রিনের আপেল মিলাতে পারবে।
আরেকটা বড় উদ্বেগ হলো ওভারস্টিমুলেটিং ভিডিও। বাচ্চাদের অনেক ভিডিওতে খুব দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন, জোরে মিউজিক, ঝলমলে রং থাকে। এগুলো ছোট শিশুর বিকাশমান মস্তিষ্কের জন্য অতিরিক্ত উদ্দীপক হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি মনোযোগ নিয়ন্ত্রণের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যদি দীর্ঘসময় স্ক্রিন ব্যবহার হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, যখন কোনো ছড়ার ভিডিও চলত, আমার ছেলেরা কিছু সময়ের জন্য স্ক্রিনের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকত। প্রথমে মনে হতো “ওরা মনোযোগ দিচ্ছে।” কিন্তু পরে বুঝলাম, প্যাসিভ তাকিয়ে থাকা আর সক্রিয় শেখা এক জিনিস না। তবে এটাও সত্যি, সব ডিজিটাল কনটেন্ট সমানভাবে ক্ষতিকর না। যদি সীমিত সময়ের জন্য বয়স উপযোগী, ধীরগতির, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট বাবা-মায়ের সাথে একসাথে দেখা হয়, তাহলে প্রভাব আলাদা হতে পারে। একে বলা হয় কো-ভিউইং। যেমন: ভিডিওতে প্রাণী দেখিয়ে বাবা-মা যদি বলেন “দেখো এটা গরু”, “গরু ঘাস খায়” তাহলে শিশুর শেখা ইন্টারঅ্যাকশন ভিত্তিক হয়ে যায়। অর্থাৎ, স্ক্রিন তখন প্যাসিভ না হয়ে কথোপকথনের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুম।
ডাক্তাররা বলেন, বিশেষ করে ঘুমানোর আগে স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর ঘুমের মানকে প্রভাবিত করতে পারে। উজ্জ্বল আলো মেলাটোনিন হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে, যা ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এখন আমরা রাতে স্ক্রিন এড়িয়ে চলি বা কমপক্ষে এক থেকে দেড় ঘন্টা আগে সকল প্রকার স্ক্রিন বন্ধ করে দেই।
যৌথ পরিবারে আরেকটা চ্যালেঞ্জ থাকে, সবাই শিশুকে শান্ত রাখতে মোবাইল দিতে চায়। “একটু কার্টুন চালাও, চুপ করবে।” এটা স্বল্পমেয়াদে কার্যকর মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে অভ্যাসে পরিণত হলে পরে স্ক্রিন ছাড়া শান্ত হওয়া কঠিন হতে পারে।
আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, শিশুর বিকাশের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী শেখার মাধ্যম হচ্ছে বাবা-মায়ের মুখ, কণ্ঠস্বর এবং পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া। একটা ছড়ার ভিডিও হয়তো কিছু সময় বিনোদন দিতে পারে। কিন্তু আসল বন্ধন, ভাষা শেখা এবং আবেগগত বিকাশ সবচেয়ে বেশি হয় যখন বাবা-মা শিশুর সাথে কথা বলেন, গান গায়, মুখভঙ্গি করে, খেলাধুলা করে।
তাই এখন আমি বেবি লার্নিং ভিডিওকে পুরোপুরি ভিলেনও বলি না, আবার ম্যাজিকাল লার্নিং সল্যুশনও মনে করি না। স্ক্রিন এর অতিরিক্ত ব্যবহার যেমন শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে তেমনি স্ক্রিনের সঠিক ও পরিমিত ব্যবহারও (২ বছরের বেশি) শিশুর জন্য উপকারি হতে পারে।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন