
মা হওয়ার আগে আমি ভাবতাম বাচ্চাকে ভালো খাবার দেওয়া, পরিষ্কার রাখা আর ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর চিন্তাটাই বুঝি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মা হওয়ার পর বুঝেছি, শিশুর জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর একটি হলো বাবা-মায়ের সাথে ইমোশনাল বন্ডিং বা মানসিক সংযোগ।
বিশেষ করে ০–৩ বছর বয়সে এই বন্ডিং একটা শিশুর ভেতরের নিরাপত্তাবোধ, আত্মবিশ্বাস আর ভবিষ্যতের আচরণ গঠনে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।
আমার ছেলেটা ছোটবেলায় খুব কান্না করত। আমি তখন নতুন মা, কিছুই বুঝতাম না। মাঝে মাঝে কোলে নিলেও শান্ত হতো না। পরে খেয়াল করলাম, যখন আমি ওর সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলি, গান গেয়ে শুনাই বা পাশে বসে থাকি, তখন ও অনেক দ্রুত শান্ত হয়ে যায়। তখন বুঝলাম, ছোট শিশুরা শুধু খাবার বা খেলনা না, বাবা-মায়ের উপস্থিতিও অনুভব করে।
আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা-মা দুজনই অনেক ব্যস্ত থাকে। আমার স্বামী ছোট ব্যবসা সামলায়, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে। আমিও ঘরের কাজ, ছোট বাচ্চা, রান্না সব মিলিয়ে প্রায়ই হাঁপিয়ে উঠি। এর মাঝে “quality time” কথাটা অনেক সময় বিলাসিতা মনে হয়। কিন্তু আসলে bonding তৈরি করতে সবসময় আলাদা সময় লাগে না, লাগে সচেতনতা।
তাই আমি এখন কিছু ছোট ছোট বিষয় মেনে চলার চেষ্টা করি।
যেমন, ছেলে যখন আমার কাছে কিছু বলতে আসে, তখন মোবাইল নামিয়ে অন্তত কয়েক মিনিট পুরো মনোযোগ দিয়ে ওর কথা শুনি। হয়তো ও খুব সাধারণ কিছু বলছে, “মা, গাড়িটা দেখো” কিন্তু আমি খেয়াল করেছি, আমি মন দিয়ে শুনলে ওর চোখে মুখে আলাদা আনন্দ ফুটে উঠে।
রাতে ঘুমানোর আগে আমি আমার ছেলের সাথে গল্প করি, বই পড়ে শুনাই। প্রতিদিন নতুন গল্প বা কখনো নিজের ছোটবেলার ঘটনাও বলি। এতে ও খুব মন দিয়ে শোনে। অনেক সময় গল্প শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়ে। এই সময়গুলো আমার কাছে অনেক শান্তির লাগে।
আমার স্বামীও এখন চেষ্টা করে বাসায় ফিরে অন্তত কিছু সময় ছেলের সাথে কাটাতে। আগে ক্লান্ত হয়ে ফোন দেখত বা টিভি চালাত। এখন বাসায় ফিরেই ছেলেকে কোলে নেয়, একটু হাঁটাহাঁটি করে, খেলনা নিয়ে বসে। আমি দেখেছি, এতে আমাদের ছেলে শুধু খুশিই হয় না বরং ওর বাবার সাথে সম্পর্কও অনেক গভীর হয়েছে।
আমরা অনেক সময় ভাবি, দামি খেলনা বা ভালো স্কুলই বাচ্চার development-এর জন্য প্রধান। কিন্তু একটা শিশু সবচেয়ে বেশি মনে রাখে তার মা-বাবা তাকে সময় দিয়েছে কি না, তাকে গুরুত্ব দিয়েছে কি না।
আমি আমার নিজের জীবন থেকে একটা জিনিস বুঝেছি, ছোট শিশুর সাথে bonding মানে সবসময় “পারফেক্ট parent” হওয়া না বরং শিশুকে অনুভব করানো যে, “আমার তোমার পাশে আছি। তুমি মন খুলে আমাদের সাথে যেকোনো বিষয়ে কথা বলতে পারো।”
এখনকার সময়ে একটা বড় সমস্যা হলো স্ক্রিন। অনেক সময় কাজ সামলাতে গিয়ে আমরা বাচ্চার হাতে মোবাইল দিয়ে দিই। আমিও দিই কখনো কখনো। কিন্তু পরে খেয়াল করেছি, যত বেশি স্ক্রিন টাইম বাড়ে, তত কম interaction হয়। তাই এখন চেষ্টা করি, দিনের কেবল একটা নির্দিষ্ট সময়ে তাকে স্ক্রিন দিতে।
এখন আমি আরেকটি জিনিস মেনে চলার চেষ্টা করি, শিশুর অনুভূতিকে ছোট না করা। আমাদের ছেলে যখন কাঁদে বা রাগ করে, আগে আমি বলতাম “এত কান্না করো না।” কিন্তু এখন ওর কান্না করা বা রাগ করার কারণ বুঝার চেষ্টা করি। ছোটদের অনুভূতিও আসলে তাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
০–৩ বছর বয়সের শিশুরা হয়তো সব কথা মনে রাখতে পারে না, কিন্তু তারা অনুভূতি মনে রাখে। কে তাকে জড়িয়ে ধরেছে, কে মন দিয়ে শুনেছে, কে তার পাশে থেকেছে, এসব ধীরে ধীরে তাদের নিজস্ব একটি পৃথিবী তৈরি করে।
আমি এখনো প্রতিদিন শিখছি। কিন্তু হয়তো অনেক সময় সঠিকভাবে সবকিছু সামলাতে পারি না। কখনো রাগ করি, কখনো ক্লান্ত হয়ে যাই। কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছি, শিশুর সাথে emotional bonding কোনো আলাদা কাজ না, এটা প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়।
একটু সময়, একটু মনোযোগ আর একটু ভালোবাসা একটি শিশুকে করে তুলতে পারে ভেতর থেকে সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন