লোগো

সীমিত সামর্থ্যেও শিশু কীভাবে শিক্ষা লাভ করতে পারে?

সীমিত সামর্থ্যেও শিশু কীভাবে শিক্ষা লাভ করতে পারে?

ফাহমিদা বেগম প্রায়ই একটা ভয় পান, তার সন্তানরা কি ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারবে? গার্মেন্টসের চাকরির টাকায় কোনোভাবে সংসার চলে, কিন্তু ভালো কোচিং, আলাদা পড়ার রুম বা দামি স্কুলের সুযোগ তাদের নেই। বড় মেয়েটা একদিন স্কুল থেকে এসে বলেছিল, “আমার বন্ধু প্রাইভেট পড়ে। আমি না পড়লে পিছিয়ে যাবো না তো?” এই প্রশ্নটা শুধু ফাহমিদার মেয়ের না, বাংলাদেশের অসংখ্য নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুর বাস্তবতা।

অনেক মা-বাবা মনে করেন, “টাকা কম মানেই ভালো শিক্ষা সম্ভব না।” কিন্তু শিশু বিকাশ ও শিক্ষা বিষয়ক গবেষণা বলছে, শিশুর শেখার ক্ষমতা শুধু অর্থের ওপর নির্ভর করে না। পরিবারের মানসিক সমর্থন, শেখার পরিবেশ, নিয়মিত অভ্যাস আর কৌতূহলও বড় ভূমিকা রাখে।
অবশ্যই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বাস্তব সমস্যা তৈরি করে। কিন্তু তার মানে এই না যে নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুরা শেখার সুযোগ হারিয়ে ফেলবে।
ফাহমিদাদের বাসায় আলাদা পড়ার টেবিল নেই। এক রুমেই সবাই থাকে। তবু ফাহমিদা একটা ছোট নিয়ম করেছেন, রাতে খাওয়ার পরে অন্তত কিছু সময় টিভি বন্ধ থাকবে। এই সহজ নিয়মটিও শিশুর মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পড়াশোনার রুটিন শিশুদের শেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবেশ নিখুঁত না হলেও “নিয়মিত সময়” অনেক কার্যকর। আরেকটা বড় ভুল ধারণা হলো, শিক্ষা মানেই শুধু বই।
আসলে শিশুর শেখা দৈনন্দিন জীবন থেকেও হয়।
যেমনঃ
● বাজারে গিয়ে টাকা গোনা
● রান্নার সময় জিনিসের নাম শেখা
● রাস্তার সাইনবোর্ড পড়া
● গল্প শোনা
● গাছ, প্রাণী বা মানুষ সম্পর্কে কথা বলা
এসবও ভাষা বিকাশ ও জ্ঞানীয় দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ফাহমিদার ছোট ছেলেটা এখন চাল গুনে গুনে সংখ্যা শিখছে। বড় বোন তাকে গল্পের বই পড়ে শোনায়। এগুলো ছোট মনে হলেও, প্রাথমিক শিক্ষার জন্য অনেক উপকারী।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সীমিত সম্পদের পরিবেশেও সাড়া-দেওয়া যোগাযোগ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ ব্যয়বহুল শিক্ষাসামগ্রী না থাকলেও, মা-বাবার সঙ্গে কথা বলা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, কৌতূহলকে উৎসাহ দেওয়া, এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটা বাস্তব বিষয় হলো, অনেক নিম্নআয়ের পরিবারে বড় সন্তানদের ওপর সংসারের দায়িত্ব পড়ে যায়। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে।
ফাহমিদার বড় মেয়েটাও মাঝে মাঝে ছোট ভাইকে সামলাতে গিয়ে নিজের পড়া বাদ দেয়। এখানে ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে দায়িত্ব শেখানো ভালো, কিন্তু তার শিক্ষার ক্ষতি হওয়া ঠিক না।
দরিদ্র পরিবারের শিশুদের স্কুলে টিকে থাকার জন্য পারিবারিক উৎসাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মা-বাবার “তুই পড়, আমরা চেষ্টা করব”, এই কথাটাই শিশুর প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভয়ভিত্তিক শিক্ষা না দেওয়া।
অনেক পরিবারে বলা হয়
“না পড়লে রিকশা চালাতে হবে”
“গরিব মানুষ পড়াশোনা না করলে শেষ”
এই ধরনের কথা কিছু সময়ের জন্য চাপ তৈরি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে শিশুর উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
ফাহমিদা এখন চেষ্টা করেন সন্তানদের ভয় না দেখিয়ে শেখাতে। বড় মেয়েটা ভালো কিছু করলে তিনি বলেন,
“তুই চেষ্টা করলে পারবি।”
এই ধরনের ইতিবাচক উৎসাহ শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
আজকাল স্বল্প খরচের শিক্ষাসামগ্রীও কিছুটা সহজলভ্য হয়েছে।
যেমনঃ
● ইউটিউবের শিক্ষামূলক কনটেন্ট
● বিনামূল্যের শেখার অ্যাপ
● সরকারি বই
● লাইব্রেরি
● স্কুলের অতিরিক্ত শিক্ষাসামগ্রী
তবে এখানে মা-বাবার তত্ত্বাবধান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মোবাইল সহজেই শুধু বিনোদনের দিকে চলে যেতে পারে।
ফাহমিদা এখন কার্টুনের পাশাপাশি মাঝে মাঝে বাংলা ছড়া, বর্ণমালা বা বিজ্ঞানভিত্তিক ভিডিও দেখানোর চেষ্টা করেন।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর শেখার গতি সবার একরকম না।
কম আয়ের পরিবারের অনেক শিশু মানসিক চাপ, অপুষ্টি বা অতিরিক্ত ভিড়ের পরিবেশের কারণে পড়াশোনায় পিছিয়ে যেতে পারে। তাই তুলনা করার চেয়ে সহায়তা করা বেশি জরুরি।
ফাহমিদার মেয়েটা গণিতে দুর্বল। আগে এজন্য তাকে বকা দেওয়া হতো। এখন বড় বোন আর মা মিলে ধীরে ধীরে অনুশীলন করায়। এতে মেয়েটার ভয় কিছুটা কমেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সহায়ক শেখার পরিবেশ শিশুর শিক্ষাগত আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।
সবশেষে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, শিক্ষা শুধু সনদপত্র না; এটা শিশুর চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজের জীবন বদলানোর শক্তি তৈরি করে।
নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুদের পথ হয়তো কঠিন। কিন্তু সঠিক সহায়তা, ধৈর্য আর শেখার পরিবেশ থাকলে তারাও ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে পারে।
কারণ অনেক সময় বড় সুযোগ শুরু হয় খুব ছোট একটা জায়গা থেকে। একজন মা ক্লান্ত শরীরে সন্তানের পাশে বসে বলছে, “চেষ্টা কর, তুই শিখতে পারবি।”

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000