লোগো

অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা কি শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, নাকি কমায়?

অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা কি শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, নাকি কমায়?

আমি ডাক্তার হওয়ার কারণে একটা বিষয় প্রায়ই খেয়াল করি, এখনকার অনেক বাবা-মা শিশুর পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। সত্যি বলতে আমিও এর বাইরে না। বিশেষ করে মা হওয়ার পর প্রথমদিকে আমারও সবসময় ভয় কাজ করত কোথাও জীবাণু আছে কিনা, মেয়ে মেঝেতে বসছে কিনা, বাইরে কিছু ধরছে কিনা। একটা সময় এমন ছিল, বাইরে থেকে বাসায় ফিরলেই সঙ্গে সঙ্গে জামা বদল, হাত ধোয়া, খেলনা পরিষ্কার নিয়ে আমি খুব বেশি কঠোর হয়ে গিয়েছিলাম। এমনকি মেয়েটা মাটিতে বসে খেললেও ভিতরে ভিতরে অস্বস্তি লাগত। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে বুঝলাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জরুরি হলেও “অতিরিক্ত জীবাণুভয়” আর স্বাস্থ্যকর স্বাস্থ্যবিধি এক জিনিস না।

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া আর প্যারেন্টিং কালচার -এ অনেক সময় এমন একটা ধারণা তৈরি হয় যেন শিশুকে সবসময় পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত পরিবেশে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এভাবে কাজ করে না।
গবেষণায় “hygiene hypothesis” নামে একটা ধারণা আছে। সহজভাবে বললে, ছোটবেলায় শিশুর শরীর পরিবেশের স্বাভাবিক কিছু জীবাণুর সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে নিজের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।
Johns Hopkins Bloomberg School of Public Health-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অতিরিক্ত জীবাণুমুক্ত পরিবেশে বড় হওয়া শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সবসময় সঠিকভাবে তৈরি নাও করতে পারে।
তবে এখানে একটা বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে, এর মানে এই না যে শিশুকে নোংরা পরিবেশে রাখা ভালো। বরং স্বাস্থ্যকর স্বাস্থ্যবিধি আর অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা -এর মধ্যে একটা ভারসম্য রাখা দরকার।
যেমনঃ
খাওয়ার আগে হাত ধোয়া,
টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধোয়া,
বাইরে থেকে এসে পরিষ্কার হওয়া,
নিরাপদ খাবার খাওয়া
CDC-এর তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস শিশুদের ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের অনেক সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতা অপ্রয়োজনীয় না। বরং সঠিক স্বাস্থ্যবিধি শিশুকে অনেক গুরুতর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু সমস্যা তখন হয়, যখন শিশুকে সবকিছু থেকে অতিরিক্ত দূরে রাখা হয়।
আমি একটা সময় মেয়েকে মাটি ছোঁয়া, বৃষ্টিতে ভেজা বা বাইরে খেলাধুলা করা নিয়েও অহেতুক চিন্তা করতাম। পরে বুঝলাম, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বাইরের খেলা আসলে শিশুর জন্য খুব উপকারী।
মাটি, ঘাস, গাছপালা, রোদ শুধু শারীরিক নড়াচড়া না, সেন্সরি এক্সপেরিয়েন্স -এরও অংশ। এগুলোর মাধ্যমে শিশুর শরীর ও মস্তিষ্ক দুটোই পরিবেশের সাথে পরিচিত হতে শেখে।
Mayo Clinic-এর বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, বাইরে খেলা কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা -এর স্বাভাবিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটা বিষয় আমি পরে বুঝেছি, সব জীবাণু একরকম না।
স্বাভাবিক পরিবেশের জীবাণু আর ক্ষতিকর সংক্রমণ এক বিষয় না। নোংরা পানি, অপরিষ্কার খাবার, অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু প্রতিটা ধুলাবালি বা বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শ -কে ভয় পাওয়াও স্বাস্থ্যসম্মত পন্থা না।
আজকাল অনেক বাসায় বারবার শক্তিশালী জীবাণুনাশক ব্যবহার করা হয়। তবে সবসময় অতিরিক্ত কেমিক্যাল ক্লিনার ব্যবহার করা প্রয়োজনীয় নয়। বিশেষ করে শিশুর আশেপাশে বেশি কেমিক্যালের সংস্পর্শ অনেক সময় ত্বক ও শ্বাসতন্ত্রের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
আমি এখন মেয়েকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা শেখাই, কিন্তু অতিরিক্ত ভয়ভীতি তৈরি করার চেষ্টা করি না। ও বাইরে খেললে পরে হাত-মুখ ধোয়, কিন্তু মাটি ছুঁলেই আমি ভয় পাই না। কারণ আমি চাই, ও স্বাস্থ্যকর স্বাস্থ্যবিধি শিখুক, “জীবাণুভয়” নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শুধু জীবাণুর সংস্পর্শে আসার উপর নির্ভর করে না। ভালো ঘুম, সুষম খাবার, টিকা, শারীরিক খেলাধুলা এবং মানসিক স্বস্তিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় বাবা-মা শুধু জীবাণু এড়ানোর দিকেই এত বেশি মনোযোগ দেন যে শিশুর সামগ্রিক জীবনযাপনের দিকটা উপেক্ষা হয়ে যায়। সবশেষে আমি যেটা বুঝেছি, শিশুকে পরিষ্কার রাখবো ঠিকই, কিন্তু তাকে “কাঁচের বাক্সে” বড় করবো না।
কারণ স্বাস্থ্যকর শৈশব মানে শুধু জীবাণু এড়িয়ে চলা নয়, বরং পৃথিবীর সাথে স্বাভাবিকভাবে পরিচিত হওয়া, খেলাধুলা করা এবং ধীরে ধীরে নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000