
শাহ আলমের ছেলে রাফির বয়স তিন বছর। ছোট্ট একটা ঘরে তাদের সংসার। খেলনা খুব বেশি নেই, বইও হাতে গোনা কয়েকটা। তবুও শাহ আলম একটা জিনিস খেয়াল করে, রাফি সারাক্ষণ আশেপাশের সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করে। রাস্তা দিয়ে গরু গেলে জিজ্ঞেস করে, “এটা কী খায়?” বৃষ্টি নামলে বলে, “পানি কোথা থেকে আসে?” জুতা সেলাইয়ের দোকানে বসে সুতা, হাতুড়ি, আঠা সহ সবকিছু নিয়েই তার কৌতূহল।
আগে শাহ আলম ভাবত, শেখা মানে শুধু বই আর স্কুল। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করে, শিশুর জন্য পুরো আশেপাশের পরিবেশটাই একটা বড় স্কুল হতে পারে।
ছোট শিশুরা সবচেয়ে ভালো শেখে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। অর্থাৎ তারা যা দেখে, ছুঁয়ে দেখে, শুনে বা ব্যবহার করে, সেগুলো থেকেই দ্রুত ধারণা তৈরি করে। এই পদ্ধতিকে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখা বলা হয়।
তাই দামি শিক্ষাসামগ্রী না থাকলেও স্থানীয় পরিবেশ ব্যবহার করেই শিশুকে অনেক কিছু শেখানো সম্ভব।
যেমন, শাহ আলম যখন সকালে বাজারে যায়, এখন মাঝে মাঝে রাফিকেও সঙ্গে নেয়। বাজারে গিয়ে সে কলা, পেঁপে, বেগুন ইত্যাদি ফল ও সবজি দেখিয়ে এদের নাম শেখানোর চেষ্টা করে। কখনো রঙ শেখায়, কখনো সংখ্যা। “দেখো, এখানে তিনটা লেবু।”
এই ধরনের বাস্তব জিনিস দেখিয়ে শেখালে শিশুর মস্তিষ্কে শেখার বিষয়গুলো বেশি স্থায়ী হয়। কারণ সে শুধু শুনছে না, চোখে দেখছে এবং বাস্তবের সাথে মিলিয়ে বুঝছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর জীবনের শুরুর পর্যায় (০–৫/৬ বছর) এ সেন্সরি লার্নিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ স্পর্শ, গন্ধ, শব্দ, রঙ ব্যবহার করে শেখা শিশুর মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় করে।
রাফি এখন রাস্তার পাশের গাছ চিনতে শিখছে। কোনটা আমগাছ, কোনটা নারকেল গাছ শাহ আলম নিজেই শেখায়। এতে শুধু গাছের নাম শেখা না, বরং শিশুর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাও বাড়ে।
বৃষ্টির দিনেও শেখার সুযোগ আছে। একদিন টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ শুনে রাফি ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তখন তার মা তাকে কোলে নিয়ে বোঝায়, “মেঘ থেকে পানি পড়ে বলেই বৃষ্টি হয়।” পরে একটা বালতিতে বৃষ্টির পানি জমিয়ে দেখায়।
এই ছোট্ট অভিজ্ঞতাই শিশুর মধ্যে প্রকৃতি সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি করে। বিজ্ঞানভিত্তিক শেখা সবসময় বই খুলে করতে হয় না।
আবার স্থানীয় পরিবেশ শিশুকে সামাজিক আচরণও শেখাতে পারে।
শাহ আলম যখন দোকানে বসে গ্রাহকদের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলে, “ধন্যবাদ” দেয়, কারো সাথে খারাপ ব্যবহার না করার চেষ্টা করে, রাফি সেগুলো দেখেই শিখছে। শিশুদের একটা বড় শেখার মাধ্যম হলো অনুকরণ। তারা বড়দের আচরণ নকল করে। তাই পরিবারের ও আশেপাশের পরিবেশ শিশুর চরিত্র গঠনে অনেক প্রভাব ফেলে।
অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারে বাবা-মায়েরা দুশ্চিন্তা করেন যে তাদের সন্তানের শেখার সুযোগ কম। কিন্তু বাস্তবে গ্রামের মাঠ, রাস্তার দোকান, বাজার, গাছপালা, নদী, পশুপাখি ইত্যাদি শেখার উপকরণ হতে পারে।
যেমনঃ
• চাল গুনে সংখ্যা শেখানো
• দোকানের সাইনবোর্ড দেখে অক্ষর চিনানো
• পাখির ডাক শুনে প্রাণী চেনানো
• রান্নার সময় সবজির নাম শেখানো
• আকাশ দেখে আবহাওয়া বোঝানো
এসব ছোট ছোট শেখা শিশুর ভাষা, চিন্তাশক্তি ও বাস্তবজ্ঞান বাড়াতে সাহায্য করে।
তবে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শেখানোর সময় তাকে ভয় দেখানো বা জোর করা উচিত না। বরং তার প্রশ্ন শুনতে হবে, ধৈর্য ধরে উত্তর দিতে হবে।
শাহ আলম এখন বুঝেছে, তার আশেপাশের সাধারণ জীবনটাই রাফির শেখার বড় জায়গা।
হয়তো তাদের বাসায় দামী বই বা খেলনা নেই, কিন্তু আছে রাস্তায় চলা রিকশা, দোকানের হিসাব, বৃষ্টির পানি, গাছের পাতা, মানুষের গল্প। আর ছোট্ট একটা শিশুর জন্য এগুলোই অনেক বড় শেখার উপকরণ হতে পারে। কারণ শিশুর শেখা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না বরং পুরো পৃথিবীটাই তার জন্য একটা খোলা ক্লাসরুম।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন