লোগো

ব্যস্ত রুটিনের মাঝেও পরিবারের জন্য সময় রাখা কেন জরুরি?

ব্যস্ত রুটিনের মাঝেও পরিবারের জন্য সময় রাখা কেন জরুরি?

ব্যস্ততা যেন আমাদের সবাইকে একদম জড়িয়ে ফেলছে। আমার স্বামী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যবসার কাজে বাইরে থাকে। বাসায় ফিরে ও ক্লান্ত থাকে, এটা খুব স্বাভাবিক। আর আমি সারাদিন দুই বাচ্চা, রান্না, ঘরের কাজ সামলে দিনের শেষে এমন ক্লান্ত হয়ে যাই যে অনেক সময় নিজের সাথেই কথা বলতে ইচ্ছা করে না। এই ব্যস্ততার মধ্যে বুঝতেই পারিনি যে আমরা একই বাসায় থাকলেও, পরিবারের সাথে খুবই কম পরিমান সময় কাটানো হচ্ছে।

আমরা অনেক সময় ভাবি “পরিবারকে সময় দেয়া” মানে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, রেস্টুরেন্টে খাওয়া বা বড় আয়োজন। কিন্তু পরে বুঝেছি, ছোট ছোট নিয়মিত মুহূর্তই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুর ইমোশনাল নিরাপত্তা অধিকাংশই তৈরি হয় নিয়মিত ইতিবাচক আলোচনার মাধ্যমে। যখন শিশু দেখে বাবা-মা তার সাথে কথা বলছে, হাসছে, খেলছে, মন দিয়ে শুনছে তখন তার ব্রেইনে নিরাপত্তা ও যোগাযোগ এর অনুভূতি তৈরি হয়। বিশেষ করে ছোট শিশুদের জন্য ফ্যামিলি ইন্টার‍্যাকশন ভবিষ্যতের আবেগের উন্নতি, ভাষাগত দক্ষতা, সামাজিকতা - সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলে।
আমি একটা সময় খেয়াল করলাম, যেদিন আমার স্বামী বাসায় ফিরে ছেলের সাথে অন্তত ২০–৩০ মিনিট খেলাধুলা করে, সেদিন ছেলের মুড অনেক ঠান্ডা থাকে। খাওয়াতেও কম সমস্যা হয়। আর যেদিন পুরো সময় সবাই আলাদা ব্যস্ত থাকে, সেদিন ও বেশি বিরক্ত করে।
পরে ইন্টারনেটে প্যারেন্টিং নিয়ে পড়তে গিয়ে বুঝলাম, এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। শিশুরা কুয়ালিটি কানেকশান থেকে ইমোশনাল রেগুলেশন শিখে। মানে তারা ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে কীভাবে আবেগকে নিয়ন্ত্রন করতে হয়, কীভাবে কমিউনিকেট করতে হয়।
আর ফ্যামিলি টাইম শুধু শিশুর জন্য না, বড়দের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি।
সারাদিন শুধু দায়িত্ব পালন করতে করতে মানুষ ইমোশনালি ডিস্কানেক্টেড হয়ে যেতে পারে। কিন্তু রাতে সবাই একসাথে বসে গল্প করা, চা খাওয়া, বা ছেলের হাসাহাসি দেখা এসব ছোট মুহূর্ত স্ট্রেস অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
তবে সত্যি কথা বলতে, ব্যস্ত জীবনে পরিবারকে সময় দেয়া সহজ হয় না।
আগে আমার স্বামী বাসায় ফিরেও তার ব্যবসার কাজ করত। আমি তখন বাসার কাজে ব্যস্ত। ছেলে মোবাইল দেখছে। দেখতে গেলে আমরা সবাই এক বাসায়, কিন্তু মানসিকভাবে আলাদা আলাদা জায়গায়।
এখন আমরা কিছু ছোট পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। যেমনঃ 
●    রাতে অন্তত একবেলা একসাথে খাওয়া
●    খাওয়ার সময় টিভি বন্ধ রাখা
●    ছেলেকে নিয়ে ১০ থেকে ২০ মিনিট গল্প করা
●    সপ্তাহে একদিন ছাদে হাঁটা
●    ঘুমানোর আগে বই পড়া
এগুলো খুব ছোট জিনিস, কিন্তু এর ইম্প্যাক্ট অনেক বড়।
আমার ছেলে এখন মাঝে মাঝে বলে, “আজকে কি আমরা সবাই একসাথে খেলব?”
এই ছোট কথাগুলোই বুঝিয়ে দেয়, শিশু আসলে খুব দামি আউটিং না, বরং কানেকশন আর সময় চায়।
গবেষণা বলে, নিয়মিত পারিবারিক ভাবের আদান প্রদান শিশুদের Anxiety কমাতে, কমিউনিকেশান স্কিল বাড়াতে এবং সেলফ ইস্টিম তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষ করে এখনকার সময়ে, যেখানে স্ক্রিন টাইম এতো বেড়ে গেছে, সেখানে সামনা সামনি সময় কাটানো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।
আর একটা জিনিস হলো, পরিবারকে সময় দেয়া এর জন্য অনেক সময় লাগে না, কন্সিস্টেন্সি টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিট করে। কিন্তু ওই ১৫ মিনিট যদি পুরো মনোযোগ দিয়ে দেওয়া যায়, সেটাও শিশুর কাছে অনেক বড় বিষয়। 
আমার স্বামী এখন ক্লান্ত থাকলেও অন্তত কিছু সময় ছেলের সাথে খেলতে বসে। কারণ আমরা দুজনেই জানি, ছোটবেলার এই সময়টা খুব দ্রুত চলে যায়।
আর শিশুরা বড় হয়ে হয়তো মনে রাখবে না তাদের কী কী খেলনা কিনে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা যা মনে রাখবে তা হলো, 
বাবা-মা তাদের সাথে সময় কাটিয়েছিল কি না,
তাদের কথা শুনেছিল কিনা বা তাদেরকে বুঝেছিল কিনা।
পরিবারকে সময় দেয়া কোনো বিলাসিতা নয়। এটা আসলে একটি পরিবারের ইমোশনাল হেলথ এর একটি প্রয়োজনীয় অংশ। কারণ একসাথে সময় কাটানো শুধু সম্পর্ক ভালো রাখে না, বরং এটি একটি পরিবারকে “পরিবার” হিসেবেও ধরে রাখে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000