
যমজ ছেলে হওয়ার পর আমি একটা জিনিস খুব দ্রুত বুঝেছি, ভাগাভাগি শেখানো ভবিষ্যতে আমাদের সবচেয়ে বড় অভিভাবকত্বের চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে। যদিও ওরা এখনো ছোট, তবুও মাঝে মাঝে একজনের খেলনা আরেকজনের হাতে গেলে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তখন বুঝতে পারি, “আমার জিনিস”, এই অনুভূতিটা খুব ছোট বয়স থেকেই তৈরি হতে শুরু করে।
আমাদের সমাজে ভাগাভাগিকে সাধারণত শুধু “ভদ্রতা” হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু শিশু মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, ভাগাভাগি আসলে আবেগগত বিকাশ, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গবেষণা বলছে, ছোটবেলায় অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া, সাহায্য করা এবং যত্ন নেওয়ার মতো ইতিবাচক সামাজিক আচরণ ভবিষ্যতের সম্পর্ক গড়ে তোলার দক্ষতা এবং আবেগগত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাগাভাগি জোর করে শেখানো যায় না।
অনেক সময় আমরা ছোট শিশুকে বলি, “এখনই খেলনাটা দাও”, “ভাগ না করলে তুমি খারাপ”, “সবাইকে দিতে হবে।” কিন্তু বিকাশগত মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, খুব ছোট শিশুর মস্তিষ্ক এখনো মালিকানাবোধ এবং সহমর্মিতা পুরোপুরি বুঝতে শেখেনি।
বিশেষ করে টডলার বয়সে “এটা আমার” অনুভূতি খুবই স্বাভাবিক। কারণ এই সময় শিশু নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে শুরু করে। তাই ভাগ না করতে চাওয়া মানেই সে স্বার্থপর, বিষয়টা এমন না।
আমি এটা বুঝেছি পারিবারিক আড্ডা বা অনুষ্ঠানে। আত্মীয়দের বাচ্চারা এলে সবাই স্বাভাবিকভাবেই খেলনা ভাগ করে নিতে বলে। কিন্তু কখনো কখনো দেখি শিশুরা আবেগগতভাবে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। তখন বুঝলাম, ভাগাভাগি শেখানো মানে শুধু খেলনা কেড়ে নেওয়া না; বরং তার অনুভূতিটাও বোঝা।
গবেষণা অনুযায়ী, সহমর্মিতাভিত্তিক নির্দেশনা জোরপূর্বক ভাগাভাগি শেখানোর চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।
তাহলে ভাগাভাগি শেখানো শুরু হবে কীভাবে?
প্রথম ধাপ হলো উদাহরণ তৈরি করা।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি শেখে পর্যবেক্ষণ থেকে। আলবার্ট বান্দুরার Social Learning Theory অনুযায়ী, শিশুরা বড়দের আচরণ অনুকরণ করে।
অর্থাৎ, যদি শিশুরা দেখে পরিবারে সবাই স্বাভাবিকভাবে খাবার, সময় বা সাহায্য ভাগ করে নিচ্ছে, তাহলে ভাগাভাগি তাদের কাছে স্বাভাবিক আচরণ হয়ে ওঠে।
এখন আমরা বাসায় সচেতনভাবে কিছু ছোট অভ্যাস অনুসরণ করার চেষ্টা করি। যেমন—
● “চলো সবাই মিলে খাই”
● “এটা দাদুর সঙ্গে ভাগ করি”
● “তুমি একটা নাও, ভাইয়াকে একটা দাও”
এই ধরনের দৈনন্দিন আচরণ থেকেই শিশুর মধ্যে ভাগাভাগির সংস্কৃতি তৈরি হয়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পালাক্রমে নেওয়া শেখানো।
ছোট শিশুরা সবসময় একসঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টা বুঝতে পারে না, কিন্তু “এখন তুমি, পরে অন্যজন”, এটা ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে। যমজ সন্তানের ক্ষেত্রে এটা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
যেমনঃ
● একজন আগে খেলবে
● পরে আরেকজনের পালা
● সময় মাপার জন্য টাইমার ব্যবহার করা
● শান্তভাবে বুঝিয়ে বলা
এগুলো ঝগড়া বা দ্বন্দ্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে একটা সাধারণ ভুল হলো, শিশুর অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়া।
যদি শিশু খেলনা দিতে না চায়, তখন সরাসরি “খারাপ” বলা ঠিক না। বরং তার অনুভূতিটা স্বীকার করা ভালো।
যেমনঃ
“তুমি এখন এটা নিয়ে খেলতে চাও, তাই না?”
এরপর অন্য কোনো বিকল্প দেওয়া যেতে পারে।
এই পদ্ধতি শিশুকে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাতে সাহায্য করে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশংসা।
যখন শিশু নিজের ইচ্ছায় কিছু ভাগ করে নেয়, তখন সেটা খেয়াল করা দরকার।
যেমনঃ
“তুমি ভাইয়ার সঙ্গে ভাগ করে খেললে, এটা খুব সুন্দর কাজ।”
ইতিবাচক প্রশংসা ভালো সামাজিক আচরণকে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে।
তবে ভাগাভাগি শেখানোর মানে এই না যে শিশুকে সবসময় নিজের জিনিস ছেড়ে দিতে হবে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সুস্থ সীমারেখাও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ব্যক্তিগত জিনিস শিশুর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্বাভাবিক। কারণ নিজের জিনিসের প্রতি দায়িত্ববোধও আবেগগত বিকাশের অংশ।
আমাদের যৌথ পরিবার সংস্কৃতিতে অনেক সময় শিশুর জিনিস সবাই অবাধে ব্যবহার করে। এতে ভাগাভাগি শেখা হয় ঠিকই, কিন্তু কখনো কখনো ব্যক্তিগত সীমারেখার ধারণা অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এখানে ভারসাম্য প্রয়োজন।
সবশেষে আমি একটা জিনিস খুব দৃঢ়ভাবে অনুভব করি, ভাগাভাগি আসলে শুধু খেলনা ভাগ করা না।
এটা সহমর্মিতা শেখা।
অন্যের প্রয়োজন বুঝতে শেখা।
একসঙ্গে থাকতে শেখা।
আর এই শিক্ষা সবচেয়ে ভালোভাবে শুরু হয় পরিবার থেকেই। কারণ একটি শিশু তখনই সত্যিকারের ভাগাভাগি শেখে, যখন সে অনুভব করে ভাগ করে নিলে ভালোবাসা কমে না, বরং সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন