
শাহ আলম প্রতিদিন রাস্তার পাশে বসে জুতা সেলাই করে। ধুলো, ময়লা, কাদা এসব তার জীবনের স্বাভাবিক অংশ। বাসায় ফিরেও সে দেখে তার তিন বছরের ছেলে রাফি সারাদিন বাইরে খেলাধুলা করে এসে হাত না ধুয়েই ভাত খেতে বসে যায়। কখনো মাটিতে বসে খেলছে, আবার সেই হাত দিয়েই চোখ-মুখ ছুঁয়ে ফেলছে। শাহ আলম আগে ভাবত, “ছোট বাচ্চা, এগুলো তো করবেই।” কিন্তু গত শীতে রাফি বারবার পেট খারাপ আর সর্দি-কাশিতে অসুস্থ হওয়ার পর সে বুঝতে শুরু করে, ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শেখানো খুব জরুরি।
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যবিধির অভ্যাস বা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শুধু পরিষ্কার থাকার জন্য না, বরং শিশুকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব পরিবার ঘনবসতিপূর্ণ বা নিম্ন আয়ের এলাকায় থাকে, সেখানে জীবাণু দ্রুত ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি থাকে।
তবে ভালো ব্যাপার হলো স্বাস্থ্যবিধি শেখানোর জন্য দামি জিনিস বা আলাদা ক্লাস দরকার হয় না। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই শিশুর জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হলো হাত ধোয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঠিকভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের অনেক সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
কিন্তু ছোট শিশুকে শুধু “হাত ধুয়ে আসো” বললে কাজ হয় না। কারণ এই বয়সে তারা নিয়মের চেয়ে অনুকরণ বেশি শেখে।
শাহ আলম এখন একটা কাজ করে। বাইরে থেকে এসে সে নিজেই রাফিকে নিয়ে কলের পাশে দাঁড়ায়। দুজন একসাথে সাবান দিয়ে হাত ধোয়। কখনো গান গেয়ে, কখনো মজা করে। এতে রাফির কাছে ব্যাপারটা বকা না, বরং খেলার মতো লাগে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট শিশুদের নতুন অভ্যাস শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রুটিন ও পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ একই কাজ নিয়মিত একইভাবে করা।
যেমন,
• খাওয়ার আগে হাত ধোয়া
• টয়লেটের পর সাবান ব্যবহার করা
• বাইরে থেকে এসে মুখ-হাত পরিষ্কার করা
• সকালে ও রাতে দাঁত ব্রাশ করা
এই কাজগুলো প্রতিদিন একই সময়ে করলে শিশুর মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এগুলোকে স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।
রাফির মা আগে দাঁত ব্রাশ করাতে খুব কষ্ট পেত। রাফি কাঁদত, পালাতো। পরে সে ছোট একটা কৌশল নেয়। ব্রাশ করার সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মজার মুখভঙ্গি করত, কখনো বলত “দাঁতের পোকা পালাচ্ছে!” এতে রাফির আগ্রহ বাড়ে।
শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছোট শিশুদের শেখানোর সময় ভয় দেখানোর চেয়ে খেলাধুলাভিত্তিক যোগাযোগ বেশি কার্যকর। কারণ ভয় সাময়িকভাবে কাজ করলেও আনন্দ নিয়ে শেখা অভ্যাস দীর্ঘস্থায়ী হয়।
পরিচ্ছন্নতার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নখ পরিষ্কার রাখা। ছোট শিশুরা মাটি, ধুলো বা খেলনা ধরার পর প্রায়ই হাত মুখে দেয়। বড় নখের মধ্যে জীবাণু জমে থাকার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই নিয়মিত নখ কেটে দেয়া দরকার।
এছাড়া শিশুকে নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখার অভ্যাসও ছোট থেকেই শেখানো ভালো। খেলনা খেলার পর জায়গামতো রাখা, ময়লা কাপড় আলাদা রাখা, এগুলো শিশুর দায়িত্ববোধও বাড়ায়।
তবে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি। অনেক সময় গরিব বা সংগ্রামী পরিবারে পানি, সাবান বা পরিষ্কার পরিবেশ সবসময় সহজলভ্য থাকে না। তাই বাবা-মায়েদের অপরাধবোধে ভোগার প্রয়োজন নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো, যতটুকু সম্ভব নিয়মিত ছোট ছোট পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলা।
শাহ আলম এখন বুঝেছে, স্বাস্থ্যবিধি শুধু “পরিষ্কার থাকা” না। এটা সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যতের অংশ।
রাফি এখনো মাঝে মাঝে হাত না ধুয়ে খেতে বসে পড়ে। কিন্তু এখন সে নিজেই অনেক সময় বলে, “আব্বু, সাবান দাও।” এই ছোট পরিবর্তনগুলোই আসলে বড় অভ্যাসের শুরু।
একটা শিশু ছোটবেলায় যা নিয়মিত দেখে ও শেখে, বড় হয়ে সেটাই তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ হয়ে যায়। তাই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শেখানো মানে শুধু আজকের অসুখ কমানো না, ভবিষ্যতের জন্যও তাকে সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন