লোগো

শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে কিনা বুঝবেন কিভাবে?

শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে কিনা বুঝবেন কিভাবে?

ফাহমিদা বেগম কিছুদিন ধরে একটা বিষয় নিয়ে চিন্তায় ছিলেন। তার তিন বছরের ছেলেটা বয়স অনুযায়ী খুব চিকন দেখাচ্ছিল। আগের মতো দৌড়াদৌড়িও করে না, মাঝেমধ্যে খেতেও চায় না। আশেপাশের মানুষ কেউ বলছে “বাচ্চা এমনই হয়”, কেউ বলছে “খেতে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে”। কিন্তু একজন মা হিসেবে ফাহমিদার মনটা শান্ত হচ্ছিল না।

বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে শিশু অপুষ্টি এখনও একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে কম আয়ের পরিবার, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বারবার অসুস্থ হওয়া, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাবে অনেক শিশু ধীরে ধীরে অপুষ্টিতে ভুগতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অপুষ্টি সবসময় খুব সহজে চোখে পড়ে না।
অনেকেই ভাবেন, শুধু খুব শুকনা শিশু মানেই অপুষ্টি। কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত ওজনের শিশুও অণুপুষ্টির ঘাটতিতে ভুগতে পারে। অর্থাৎ শরীরে ক্যালোরি থাকলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি না-ও থাকতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী, অপুষ্টি বলতে শুধু কম ওজন না; বরং বয়স অনুযায়ী উচ্চতা কম হওয়া, বয়স অনুযায়ী ওজন কম হওয়া, শরীরের দুর্বলতা, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি সবকিছুকেই বোঝায়। শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে কিনা, যেসব লক্ষণ খেয়াল করা জরুরি
১. বয়স অনুযায়ী ওজন বা উচ্চতা কম হওয়া
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলোর একটি।
যদি শিশু বয়স অনুযায়ী খুব কম ওজনের হয়, বা একই বয়সের অন্য শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট দেখায়, তাহলে সেটা অপুষ্টির ইঙ্গিত হতে পারে।
ফাহমিদার ছেলে আগের জামা অনেকদিন পরেও পরতে পারছিল। তখন তিনি বুঝতে শুরু করেন, শিশুর বৃদ্ধি হয়তো ঠিকমতো হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুর বৃদ্ধি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশুদের ওজন ও উচ্চতা মাপানো উচিত।

২. বারবার অসুস্থ হওয়া
অপুষ্ট শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
ফলে—
●    ঘন ঘন জ্বর
●    কাশি
●    ডায়রিয়া
●    ত্বকের সংক্রমণ
●    দুর্বলতা
এসব বেশি দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অপুষ্টি এবং সংক্রমণ একে অপরকে আরও খারাপ করতে পারে। অর্থাৎ অপুষ্ট শিশুর অসুখ বেশি হয়, আর অসুখের কারণে আবার পুষ্টির ঘাটতি বাড়ে।

৩. খুব কম খাওয়া বা খেতে অনীহা
অনেক অপুষ্ট শিশুর খাওয়ার রুচি কমে যেতে পারে।
তবে শুধু “কম খায়” মানেই অপুষ্টি না। কারণ অনেক toddler-ই কিছু সময় খাবার বাছাবাছি করে। কিন্তু যদি দীর্ঘসময় ধরে শিশু খুব কম খায় এবং বৃদ্ধিও কমে যায়, তাহলে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

৪. সবসময় ক্লান্ত বা নিষ্ক্রিয় থাকা
শিশু যদি আগের মতো খেলাধুলা না করে, সবসময় দুর্বল লাগে বা খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায়, তাহলে সেটা অপুষ্টির লক্ষণ হতে পারে।
ফাহমিদা খেয়াল করেছিলেন, তার ছেলে আগে যেভাবে সারাদিন দৌড়াতো, এখন তেমন নেই।

৫. চুল, ত্বক বা চোখে পরিবর্তন
কিছু ক্ষেত্রে অপুষ্টির কারণে—
●    চুল রুক্ষ বা পাতলা হয়ে যাওয়া
●    ত্বক শুষ্ক হওয়া
●    চোখ ফ্যাকাশে দেখানো
●    ঠোঁট ফেটে যাওয়া
এসবও দেখা যেতে পারে।
বিশেষ করে আয়রনের ঘাটতি হলে শিশুর মুখ ফ্যাকাশে লাগতে পারে।

৬. শেখা বা মনোযোগে সমস্যা
দীর্ঘদিনের অপুষ্টি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
UNICEF ও WHO বলছে, শৈশবের শুরুতে সঠিক পুষ্টি শিশুর স্মৃতি, শেখার ক্ষমতা এবং জ্ঞানীয় বিকাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ শুধু শরীর না, মস্তিষ্কের বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফাহমিদা পরে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছেলেকে নিয়ে যান। সেখানে ওজন মেপে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অপুষ্টি সন্দেহ হলে নিজে নিজে সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে যদি শিশু—
●    দ্রুত ওজন হারায়
●    খুব দুর্বল হয়ে যায়
●    ফুলে যায়
●    খেতে একদম না চায়
●    বারবার অসুস্থ হয়
তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
অনেকেই ভাবেন পুষ্টিকর খাবার মানেই খুব দামী খাবার। কিন্তু বাস্তবে স্থানীয় ও সাশ্রয়ী খাবার দিয়েও সঠিক অনুপাতে পুষ্টি গ্রহণ অনেকটা সম্ভব।
যেমনঃ
●    ডিম
●    ডাল
●    ছোট মাছ
●    কলা
●    শাকসবজি
●    ভাতের সাথে ডাল ও ডিম
●    মৌসুমি ফল
এসবও শিশুর পুষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফাহমিদা এখন চেষ্টা করেন অন্তত প্রতিদিন একবেলা ডিম বা ডাল রাখতে। সবসময় সঠিকভাবে হয় না, কিন্তু ছোট ছোট পরিবর্তনও উপকারী হতে পারে।

সবশেষে একটা বিষয় খুব গুরুত্ব, অপুষ্টি মানে শুধু “খাবার কম পাওয়া” না। অনেক সময় জ্ঞান, স্বাস্থ্যবিধি, বারবার অস্টহিকভাব,অনিরাপদ পানি বা খাবার গ্রহণের অভ্যাস-এর কারণেও এটি হতে পারে।
তাই শিশুর বৃদ্ধি, আচরণ ও শক্তির দিকে নজর রাখা জরুরি।
কারণ অনেক সময় একটি শিশু মুখে কিছু না বললেও, তার শরীর চুপচাপ সাহায্য চাইতে থাকে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000