
আমি একজন চাকরিজীবী বাবা। সত্যি কথা বলতে কী, অনেক সময় ক্লান্তির কারণে মোবাইল বা কার্টুন আমাদের জন্য সহজ সমাধান হয়ে যায়। অফিস থেকে ফিরে যখন মাথা আর কাজ করতে চায় না, তখন বাচ্চাকে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে রাখাটা বেশ সহজ মনে হয়। আমিও করেছি। বিশেষ করে আমার চার বছরের ছেলে খুব দ্রুত ইউটিউব আর কার্টুনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। একসময় এমন হয়েছিল, মোবাইল না দিলে সে বিরক্ত হয়ে যেত। তখন আমি আর ওর মা বুঝলাম, বিষয়টা নিয়ে একটু সচেতন হওয়া দরকার।
কেননা অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়া এবং সামাজিক মেলামেশার সুযোগ কমে যাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।
তবে বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। এখনকার সময়ে স্ক্রিন পুরোপুরি বাদ দেওয়া সহজ নয়। তাই আমি এখন বেশি গুরুত্ব দেই স্ক্রিনের বাইরেও যেন শিশুর দিন আনন্দে ভরে থাকে। আর মজার ব্যাপার হলো, সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেওয়ার জন্য সবসময় দামি খেলনা বা বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না।
আমি আগে ভাবতাম, শিশুদের বিনোদন মানেই নতুন খেলনা বা বাইরে ঘুরতে যাওয়া। কিন্তু এখন বুঝেছি, বেশিরভাগ সময় তারা আসলে চায় একটু মনোযোগ, একটু সঙ্গ আর একসাথে কাটানো কিছু সময়।
আমাদের বাসায় এখন কিছু স্ক্রিনবিহীন কার্যক্রম নিয়মিত করার চেষ্টা করি।
যেমন, ছবি আঁকা।
আমার ছেলে এখন যেকোনো কিছু আঁকতে ভালোবাসে— গাড়ি, চাঁদ, মাছ, এমনকি নিজের কল্পনা থেকে নানা রকম ছবি। আগে শুধু “ভালো হয়েছে” বলেই শেষ করতাম। এখন মাঝে মাঝে ওর পাশে বসে আমিও আঁকি।
শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ছবি আঁকা ও সৃজনশীল খেলাধুলা শিশুদের হাতের সূক্ষ্ম দক্ষতা, কল্পনাশক্তি এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
আরেকটা দারুণ কার্যক্রম হলো কল্পনাভিত্তিক খেলা।
যেমন—
• দোকানদার-ক্রেতা খেলা
• ডাক্তার-রোগী খেলা
• রান্নাবাটি খেলা
• খেলনা গাড়ির গ্যারেজ বানানো
• স্কুল-স্কুল খেলা
বাইরে থেকে এগুলো খুব সাধারণ মনে হলেও, এসব খেলার মধ্য দিয়ে শিশু ভাষা ব্যবহার করে, সমস্যা সমাধান করতে শেখে এবং কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে।
আমার ছেলে এখন খেলনা যন্ত্রপাতি নিয়ে নানা কিছু “মেরামত” করার অভিনয় করে। সম্ভবত আমাকে ঘরের ছোটখাটো কাজ করতে দেখেই শিখেছে। তখন বুঝতে পারি, শিশুরা আমাদের দেখেই কত কিছু শেখে।
গল্প বলাও একটি অসাধারণ স্ক্রিনবিহীন বিনোদন। আমার বাবা এখনো মাঝে মাঝে নাতিকে গ্রামের গল্প শোনান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখন ছেলে মোবাইল বা কার্টুনের কথা একদম ভুলে যায়। তাছাড়া গল্প শোনা শিশুদের ভাষা দক্ষতা, শব্দভাণ্ডার এবং কল্পনাশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
আমরা মাঝে মাঝে “গল্প বানানোর খেলা” খেলি। আমি গল্পের শুরু করি, তারপর ছেলে নিজের মতো করে পরের অংশ বলে। অনেক সময় গল্প এত মজার দিকে চলে যায় যে আমরা নিজেরাই হেসে ফেলি।
শারীরিক খেলাধুলাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন অনেক শিশু ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটায়। কিন্তু ছোট শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য নিয়মিত দৌড়ঝাঁপ, লাফালাফি আর নড়াচড়া প্রয়োজন।
তাই সুযোগ পেলেই আমরা
• বল খেলা
• লুকোচুরি
• বালিশ যুদ্ধ
• ছাদে হাঁটাহাঁটি
• পার্কে যাওয়া
• দৌড় প্রতিযোগিতা
• বাবল নিয়ে খেলা
এসব করার চেষ্টা করি।
এগুলো শুধু শরীরের জন্যই ভালো না, বরং শিশুদের মনও প্রফুল্ল রাখে।
আরেকটা বিষয় আমি পরে বুঝেছি, শিশুদের সবসময় ব্যস্ত রাখারও দরকার নেই। অনেক সময় একটু একঘেয়েমিও উপকারী হতে পারে।
আগে ছেলে “বোর লাগছে” বললেই মোবাইল দিয়ে দিতাম। এখন সঙ্গে সঙ্গে দিই না। কিছুক্ষণ পর দেখি, সে নিজেই ব্লক দিয়ে কিছু বানাচ্ছে, গাড়ি সাজাচ্ছে বা নতুন কোনো খেলা আবিষ্কার করছে। এর ফলে শিশুদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা গড়ে ওঠে।
যৌথ পরিবারে একটা বাড়তি সুবিধা আছে। আমার বাবা-মা নাতিদের সঙ্গে অনেক পুরোনো খেলা খেলেন।
যেমন,
• ছড়া বলা
• হাততালি খেলা
• শব্দ চিনে বলা
• লুডু
• ধাঁধা
• "এটা কী?" ধরনের অনুমানের খেলা
এসব খেলায় স্ক্রিন লাগে না, কিন্তু হাসি-আনন্দ আর যোগাযোগ অনেক বেড়ে যায়।
তবে একটা বিষয় আমি খুব গুরুত্ব দিয়ে শিখেছি, বাবা-মায়ের নিজের আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আমি যদি সারাক্ষণ মোবাইল হাতে থাকি, তাহলে শিশুর কাছেও সেটাই স্বাভাবিক মনে হবে। তাই এখন অন্তত কিছু সময় আমরা সবাই মিলে মোবাইল দূরে রাখার চেষ্টা করি।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন