
আমার ছেলে এখন তিন বছরের। আর ছোট মেয়েটা মাত্র তিন মাসের। আমরা শহরে থাকি, কারণ আমার স্বামীর ব্যবসা এখানে। কিন্তু আমাদের দুই পরিবারের বড়রা যেমন দাদা-দাদী, নানা-নানী, সবাই গ্রামে থাকেন। তাই বছরের ছুটির সময়গুলোতে আমরা গ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করি। সত্যি কথা বলতে, আগে আমি ভাবতাম এটা শুধু “আত্মীয়দের সাথে দেখা করা”। কিন্তু মা হওয়ার পর বুঝেছি, এই সম্পর্কগুলো শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।
আমার ছেলে শহরে খুব চঞ্চল থাকে। কিন্তু গ্রামে গিয়ে দাদার সাথে হাঁটা, নানীর পাশে বসে গল্প শোনা, গরু দেখা, উঠানে দৌড়ানো এগুলো করতে ওর মধ্যে অন্যরকম শান্তি দেখি।
শিশুমনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট শিশুদের আবেগগত নিরাপত্তা (emotional security) শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গ থেকেই নয়, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকেও গড়ে উঠতে পারে। শিশুর জীবনে যখন একাধিক যত্নশীল ও স্নেহশীল বড় মানুষ থাকে, তখন তার নিরাপত্তাবোধ, আত্মবিশ্বাস এবং সম্পর্কের প্রতি আস্থা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
আমি নিজের ছেলের মধ্যেই এটা দেখেছি। ও যখন দাদীর সঙ্গে থাকে, তখন এক ধরনের বিশেষ মনোযোগ পায়। দাদী ধীরে ধীরে কথা বলেন, গল্প করেন, খাওয়ান। এই ধীর ও স্নেহময় যোগাযোগ শিশুকে আবেগগতভাবে শান্ত থাকতে এবং নিরাপদ অনুভব করতে সাহায্য করে।
এখনকার শহুরে জীবনে বাবা-মা অনেক ব্যস্ত থাকে। আমার স্বামী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাইরে থাকে। আমি বাসায় দুই বাচ্চা সামলাই।
কিন্তু গ্রামে গেলে দেখি, দাদা-দাদী বা নানা-নানীরা শিশুর সাথে অনেক ধৈর্য নিয়ে সময় কাটাতে পারেন। আর এই সময়গুলো শিশুর emotional bonding (আবেগগত বন্ধন)-এর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণা অনুযায়ী, দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গে নিয়মিত ইতিবাচক যোগাযোগ শিশুদের ভাষাগত দক্ষতা, সামাজিক আচরণ এবং মানসিক স্থিতিস্থাপকতা (emotional resilience) গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষ করে গল্প বলা, ছড়া শেখানো, পুরোনো অভিজ্ঞতা শোনানো শিশুর ভাষা ও কল্পনাশক্তির বিকাশে ভালো প্রভাব ফেলে।
আমার ছেলে এখনো গ্রামে গিয়ে নানুর মুখে একই গল্প বারবার শুনতে চায়। আমরা বড়রা হয়তো বিরক্ত হতাম, কিন্তু শিশুরা রিপিটেশন খুব উপভোগ করে।
আরেকটা জিনিস আমি খেয়াল করেছি, গ্রামের পরিবেশ নিজেও শিশুদের জন্য আলাদা শেখার অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
আমার ছেলে শহরে বইয়ে গরু-ছাগল দেখে, কিন্তু গ্রামে গিয়ে বাস্তবে দেখে। পুকুর, গাছ, মাঠ, মুরগি ওর কাছে সুন্দর লাগে।
শিশুদের ইন্দ্রিয়গত বিকাশের (sensory development) জন্য বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু স্ক্রিন বা খেলনা নয়, আশপাশের বাস্তব পরিবেশও তাদের মস্তিষ্কের বিকাশে (brain development) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে আবেগগত বন্ধন (bonding) শুধু একসঙ্গে থাকার মাধ্যমে তৈরি হয় না; অর্থবহ যোগাযোগও (interaction) সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমি খেয়াল করি, যখন দাদা ওকে নিয়ে হাঁটতে যায় বা নানী পাশে বসে খাওয়ায়, তখন ও নিজেকে খুব বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সম্পর্কগুলো শিশুকে পারিবারিক পরিচয়ও শেখায়।
এখনকার অনেক শিশু শুধু মা-বাবার ছোট পরিবারেই বড় হয়। ফলে পরিবারের শিকড় বা পারিবারিক গল্পগুলো থেকে দূরে থাকে। কিন্তু দাদা-দাদি বা নানা-নানিরর সাথে সময় কাটালে তারা পরিবার, সংস্কৃতি, গ্রামের জীবন সম্পর্কে জানতে পারে।
আমার ছেলে এখন গ্রামে গেলে বলে,
“এটা দাদুর গাছ।”
“এখানে নানু থাকেন।”
এই ছোট ছোট সংযোগগুলো (connection) শিশুর মধ্যে পরিবারে নিজের জায়গা আছে, এমন অনুভূতি বা sense of belonging গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
তবে একটা বিষয় সত্যি, সব প্রজন্মের প্যারেন্টিং ধরণ এক রকম হয় না।
অনেক সময় দাদা-দাদি বা নানা-নানিরা একটু বেশি আদর করেন, কিছু নিয়মও শিথিলভাবে দেখেন। এটা নিয়ে আমাদের মধ্যেও মাঝে মাঝে মতের অমিল হয়। আগে এসব নিয়ে আমি বেশ চিন্তা করতাম। পরে বুঝেছি, ছোটখাটো কিছু পার্থক্য স্বাভাবিক। তবে শিশুর নিরাপত্তা (safety) বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত (health-related) বিষয়ে শান্তভাবে এবং সম্মানজনকভাবে কথা বলা খুবই জরুরি।
আর একটি বিষয় আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, দূরে থাকলেও আবেগগত বন্ধন (bonding) ধরে রাখা সম্ভব। আমরা এখন মাঝে মাঝেই ভিডিও কলে ছেলেকে দাদী বা নানুর সঙ্গে কথা বলাই। যদিও এটি সরাসরি দেখা হওয়ার বিকল্প নয়, তবুও পরিচিত মুখ ও কণ্ঠস্বর শিশুর আবেগগত সংযোগ (emotional connection) বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
নিয়মিত এই ছোট ছোট যোগাযোগগুলো শিশুকে মনে করিয়ে দেয় যে, তার জীবনে তাকে ভালোবাসে ও যত্ন করে, এমন অনেক মানুষ রয়েছে।
আমি এখন বুঝি, শিশুর বড় হওয়ার জন্য শুধু ভালো স্কুল বা খেলনা যথেষ্ট না। তার দরকার এমন মানুষ, যারা তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসবে, গল্প শুনবে, সময় দেবে।
আর অনেক সময় দাদা-দাদী, নানা-নানীর সেই ধৈর্য আর স্নেহ শিশুর মনে এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে।
হয়তো শিশুরা বড় হয়ে সব ঘটনা মনে রাখবে না। কিন্তু তারা মনে রাখবে,
দাদীর হাতের খাবার,
নানুর গল্প,
দাদার সাথে মাঠে হাঁটা,
আর গ্রামের সেই উষ্ণ অনুভূতি।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন