
বিশেষজ্ঞরা বলেন, হেলদি ভাই-বোন সম্পর্ক তখনই তৈরি হয় যখন সেখানে আনন্দ, ইন্টার্যাকশন আর ভলান্টারি বন্ডিং থাকে, শুধুমাত্র দায়িত্ব না। আরেকটা বড় বিষয় হলো...
ফাহমিদা বেগমের বাসায় আলাদা খেলনার বাক্স নেই, বড় কোনো খেলার ঘরও নেই। কিন্তু বিকেল হলেই তার তিন সন্তান মিলে পুরো ঘরটাকে যেন খেলাধুলার দুনিয়া বানিয়ে ফেলে। কখনো বড় দুই বোন ছোট ভাইকে নিয়ে “স্কুল স্কুল” খেলে, কখনো বালিশ দিয়ে ঘর বানায়, কখনো আবার ঝগড়া করতে করতেই আবার খেলতে শুরু করে।
বাইরে থেকে দেখলে এগুলো সাধারণ শিশুদের খেলা মনে হতে পারে। কিন্তু শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইবোনদের একসাথে খেলাধুলা করা শিশুর মানসিক, সামাজিক ও ভাষাগত বিকাশে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে স্বল্প উপার্জন বা ছোট বাসার পরিবারে, যেখানে ব্যয়বহুল বিনোদন কম থাকে, সেখানে ভাই-বোনের সাথে খেলা অনেক সময় শিশুদের সবচেয়ে বড় শেখার জায়গা হয়ে ওঠে।
ফাহমিদার ছোট ছেলে অনেক কিছুই তার বড় দুই বোনকে দেখে শিখেছে। “এটা দাও”, “খাবো না”, “আমি পারবো”- এরকম ছোট ছোট কথাগুলোও সে খেলতে খেলতেই শিখেছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ভাই-বোন ইন্টার্যাকশন শিশুর ভাষা শেখার গতি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করতে পারে। কারণ শিশুরা বড় সদস্যদের চেয়ে ভাইবোনের সাথে বেশি স্বাভাবিকভাবে জোগাযোগ করে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক দক্ষতা।
ভাইবোনদের সাথে খেলতে গেলে শিশু শেখে—
● সিকুয়েন্স মেনে চলা
● ভাগাভাগি করা
● হেরে যাওয়া
● নিজের কথা বলা
● অন্যের অনুভূতি বোঝা
এসব দক্ষতা ভবিষ্যতের বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, কল্পনাভিত্তিক খেলাধুলা বা ভাইবোনদের সাথে গল্প বানিয়ে খেলা শিশুর আবেগ বুঝতে ও সামলানোর ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। যেমন—
● রান্না রান্না খেলা
● ডাক্তার পেশেন্ট খেলা
● দোকানদার খেলা
● টিচার স্টুডেন্ট খেলা
এসব খেলায় শিশুরা রোল প্লে করতে গিয়ে অন্য মানুষের পার্স্পেক্টিভ বোঝার চেষ্টা করে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইমোশনাল সাপোর্ট।
যেসব পরিবারে মা-বাবা অনেক ব্যস্ত থাকেন, সেখানে ভাইবোন অনেক সময় একে অপরের সবচাইতে কাছের সঙ্গি হয়ে ওঠে।
ফাহমিদা কাজে গেলে বড় দুই বোন ছোট ভাইকে গল্প শোনায়, খাওয়ায়, খেলায়। এতে ছোট ছেলেটা কম একাকীত্ব বোধ করে।
তবে এখানে ব্যালেন্স থাকতে হবে।
ভাইবোন বন্ডিং ভালো, কিন্তু যেকোন একজন সন্তানের ওপর অতিরিক্ত কেয়ারগিভিং বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক না। একসাথে খেলাধুলা আর “দ্বিতীয় মা” বানিয়ে ফেলা, দুইটা আলাদা বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, হেলদি ভাই-বোন সম্পর্ক তখনই তৈরি হয় যখন সেখানে আনন্দ, ইন্টার্যাকশন আর ভলান্টারি বন্ডিং থাকে, শুধুমাত্র দায়িত্ব না।
আরেকটা বড় বিষয় হলো স্ক্রিন টাইম কমানো।
আজকাল অনেক শিশু একা একা মোবাইল বা টিভি দেখে সময় কাটায়। কিন্তু ভাইবোন একসাথে খেলা করলে স্বাভাবিক ভাবেই স্ক্রিন নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।
ফাহমিদার বাসায় এখন মাঝে মাঝে পুরনো কাগজের বক্স দিয়ে বাসা বানানো হয়, কখনো কাগজের নৌকা দিয়ে খেলা হয়, কখনো রিকশার পুরনো টায়ার গড়িয়ে প্রতিযোগিতা হয়।
এই ধরনের শারীরিক খেলাধুলা শিশুর চলাফেরার দক্ষতা ও শরীরের সমন্বয় ক্ষমতা বিকাশে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সক্রিয় খেলাধুলা শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে, মন ভালো রাখতে এবং মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
তবে ভাইবোনদের মধ্যে মনোমালিন্যও হবে। এটা স্বাভাবিক।
অনেক মা-বাবা ভাবেন, “সবসময় মিলেমিশে খেলতে হবে।” কিন্তু সাইকোলজিস্টরা বলছেন, ছোটখাটো কনফ্লিক্ট থেকেও শিশু সমস্যা সমাধান শেখে।
গুরুত্বপূর্ণ হলো—
● একে অপরকে অপমানজনক কথা না বলা
● মনোমালিন্য যেন হাতাহাতি পর্যায় না যায় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে
● এক পক্ষকে সবসময় দোষী না বানানো
ফাহমিদা এখন চেষ্টা করেন ছোটখাটো ঝগড়ায় সঙ্গে সঙ্গে রিঅ্যাক্ট না করে আগে তাদের নিজেদের মধ্যে সমাধান করতে দিতে।
কারণ এতে Negotiation Skill তৈরি হতে পারে।
মনে রাখতে হবে Sibling Play - এর জন্য খুব দামী খেলনার দরকার হয় না।
অনেক সময় সবচেয়ে আনন্দময় খেলা হয় খুব সাধারণ জিনিস দিয়ে।
যেমন—
● বালিশ দিয়ে দুর্গ বানানো
● কাগজ বা পুতুল কেটে পুতুল বানানো
● দৌড় প্রতিযোগিতা
● একসাথে রান্না রান্না খেলা
● মাটিতে দাগ কেটে খেলা
এসব খেলায় কল্পনা বেশি কাজ করে, যেটা Brain Development এর জন্যও উপকারী।
ফাহমিদাদের সংসারে হয়তো অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু সন্ধ্যায় যখন তিন ভাইবোন একসাথে হেসে খেলে, তখন এই ছোট ঘরটাও অনেক বড় মনে হয়।
কারণ শিশুর শৈশবের সবচেয়ে মূল্যবান খেলনা অনেক সময় কোনো জড়বস্তু না, বরং পাশে থাকা আরেকটা ছোট্ট মানুষ।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন