লোগো

শিশুর মধ্যে কৌতূহল গড়ে তোলার উপায়

শিশুর মধ্যে কৌতূহল গড়ে তোলার উপায়

যমজ ছেলে হওয়ার পর একটা বিষয় আমি খুব কাছ থেকে বুঝতে শুরু করেছি, ছোট শিশুরা পৃথিবীকে আমাদের মতো দেখে না। আমরা যেখানে একটা সাধারণ চামচ দেখি, ওরা সেখানে নতুন একটা শব্দ, নতুন একটা স্পর্শ, নতুন একটা অভিজ্ঞতা খুঁজে পায়। কয়েকদিন আগে আমার এক ছেলে অনেকক্ষণ ধরে পর্দার নড়াচড়া দেখছিল। বাতাসে কাপড় দুলছে, আর সে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তখন হঠাৎ মনে হলো, কৌতূহল যেন শিশুদের ভেতরে থাকা এক স্বাভাবিক শক্তি।

শিশুর মস্তিষ্ক জন্মের পর খুব দ্রুত বিকশিত হয়। বিজ্ঞানীরা বলেন, জীবনের প্রথম কয়েক বছরে মস্তিষ্কের বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত ঘটে। আর এই সময় কৌতূহল শিশুদের স্বাভাবিকভাবেই শেখার দিকে টেনে নিয়ে যায়। এক অর্থে, কৌতূহলই তাদের শেখার চালিকাশক্তি।
তবে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, কৌতূহল জোর করে তৈরি করা যায় না। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হয়, যেখানে শিশু নিরাপদ বোধ করে এবং নিজের মতো করে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারে।
আমাদের সমাজে অনেক সময় শিশুরা বেশি প্রশ্ন করলে বড়রা বলে, “এত প্রশ্ন করো কেন?”, “চুপ করে বসো”, কিংবা “বড় হলে বুঝবে।” কিন্তু শিশু মনোবিজ্ঞান বলছে, প্রশ্ন করা আসলে সুস্থ মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের একটি স্বাভাবিক লক্ষণ।
যদিও আমার ছেলেরা এখনো খুব ছোট, তবুও আমি লক্ষ্য করি, ওরা কোনো শব্দ শুনলে মাথা ঘোরায়, নতুন মুখ দেখলে মন দিয়ে তাকিয়ে থাকে, নতুন কোনো জিনিস ছুঁতে চায়। এই ছোট ছোট অনুসন্ধানই ভবিষ্যতের কৌতূহলের ভিত্তি তৈরি করে।
এখন অনেক বাসায় বাচ্চা একটু অস্থির হলেই মোবাইল বা ঝলমলে খেলনা সামনে দেওয়া হয়। এতে শিশুর মনোযোগ কিছু সময়ের জন্য আটকে থাকে ঠিকই, কিন্তু নিজের মতো করে আবিষ্কার করার সুযোগ কমে যেতে পারে।
বরং সাধারণ জিনিস অনেক সময় কৌতূহল বাড়াতে বেশি সাহায্য করে।
যেমন—
• রঙিন কাপড়
• কাঠের চামচ
• পানির শব্দ
• আয়নায় নিজের মুখ দেখা
• নরম বা খসখসে ভিন্ন ধরনের স্পর্শ
• নিরাপদ ঘরোয়া ব্যবহার্য জিনিস
এসব দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা শিশুর ইন্দ্রিয়ভিত্তিক শেখাকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া।
আমার শ্বশুর একদিন মজা করে বলছিলেন, “এত ছোট বাচ্চার আবার কৌতূহল কী!” কিন্তু আসলে জন্মের পর থেকেই শিশুরা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিখতে শুরু করে। তারা মানুষের মুখ, কণ্ঠস্বর, অভিব্যক্তি আর প্রতিক্রিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর আগ্রহের প্রতি সাড়া দেওয়া তার কৌতূহল ও আত্মবিশ্বাস দুটোই বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। যখন একটি শিশু কোনো কিছু দেখিয়ে মনোযোগ চায়, আর মা-বাবা তার প্রতি সাড়া দেন, তখন সে ধীরে ধীরে শেখে, “আমার দেখা, জানা আর আবিষ্কার করা গুরুত্বপূর্ণ।”
এই কারণেই চোখে চোখ রেখে কথা বলা, প্রতিক্রিয়া দেওয়া এবং সময় নিয়ে যোগাযোগ করা এত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটা বিষয় আমি সচেতনভাবে করার চেষ্টা করি, সবসময় “না” না বলা।
অবশ্যই নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় আমরা অপ্রয়োজনীয় বাধা দিই। যেমন, “ওটা ধরো না”, “ওদিকে যেও না”, “নোংরা হবে।” ফলে শিশু ধীরে ধীরে নতুন কিছু চেষ্টা করার আগ্রহ হারাতে পারে।
তাই আমরা বাসায় এমন একটি নিরাপদ জায়গা রাখার চেষ্টা করি, যেখানে ওরা নিজের মতো করে নড়াচড়া করতে পারে, দেখতে পারে, স্পর্শ করতে পারে।
যৌথ পরিবারে এটা একটু কঠিন হতে পারে। কারণ বড়রা স্বাভাবিকভাবেই বেশি চিন্তা করেন। “পড়ে যাবে”, “মুখে দিয়ে ফেলবে”, “এটা সরাও”, এসব কথার পেছনে ভালোবাসাই কাজ করে। তবে আমি ধীরে ধীরে বুঝেছি, নিরাপদ সীমার মধ্যে অনুসন্ধানের সুযোগ শিশুর বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয়।
কৌতূহল বাড়ানোর আরেকটি শক্তিশালী উপায় হলো শিশুর সঙ্গে কথা বলা।
শিশু পুরো ভাষা না বুঝলেও কথোপকথন তার ভাষা শেখার ভিত্তি তৈরি করে। আমি প্রায়ই ছেলেদের সঙ্গে খুব সাধারণ বিষয় নিয়েও কথা বলি। যেমন, “এটা আলো”, “ওটা পাখি”, “বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।” এই ধরনের বর্ণনা শিশুর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
সবশেষে একটা বিষয় আমি খুব বিশ্বাস করি, কৌতূহলী শিশু গড়ে তুলতে সবসময় দামি খেলনার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় সময়, ধৈর্য আর আন্তরিক যোগাযোগ।
কারণ কৌতূহল শুধু নতুন কিছু জানার ইচ্ছা নয়। যখন একটি শিশু নিরাপদ বোধ করে, তখন সে পৃথিবীকে জানতে চায়, নতুন কিছু দেখতে চায়, প্রশ্ন করতে চায়, নিজের মতো করে অনুসন্ধান করতে চায়। আর সেখান থেকেই তার শেখার পথ সত্যিকার অর্থে শুরু হয়।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000