লোগো

একটি সহানুভূতিশীল পরিবার গড়তে কী করা দরকার?

একটি সহানুভূতিশীল পরিবার গড়তে কী করা দরকার?

আমি ছোটবেলায় একটা কথা খুব বেশি শুনতাম, “বড়দের কথা শুনতে হয়।” কিন্তু খুব কমই শুনেছি, “অন্যের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করো।” বাবা হওয়ার পর বুঝতে পারছি, শুধু ভদ্রতা শেখানো যথেষ্ট না, সহানুভূতিও শেখানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবারে সহানুভূতির সংস্কৃতি থাকলে শুধু সম্পর্কই ভালো হয় না, শিশুর ব্যক্তিত্ব, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা এবং ভবিষ্যতের সম্পর্কগুলোর ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

আমি একজন চাকরিজীবী বাবা। অফিসের চাপ, সংসারের দায়িত্ব, আর্থিক টানাপোড়েন, সব মিলিয়ে অনেক সময় ধৈর্য ধরে কথা বলা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু আমার চার বছরের ছেলে আর দুই বছরের মেয়েকে বড় করতে গিয়ে একটা জিনিস পরিষ্কারভাবে বুঝেছি, শিশুরা শুধু আমাদের কথা না, আমাদের আচরণও গ্রহণ করে।
আমি যদি সবসময় রাগ করে কথা বলি, কারও অনুভূতিকে গুরুত্ব না দিই, তাহলে শিশুরাও সেটাকেই স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে শিখতে পারে।
মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, সহানুভূতি হলো অন্যের অনুভূতি বুঝতে পারা এবং সেটি অনুভব করার ক্ষমতা। আর এই দক্ষতা পুরোপুরি জন্মগত নয়; এটি পরিবেশ ও পারস্পরিক যোগাযোগ এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
অর্থাৎ পরিবারই হলো সহানুভূতি শেখার প্রথম জায়গা।
আমি আগে অনেক সময় ছেলের কান্নাকে “অতিরিক্ত আবেগ” ভেবে ফেলতাম। খেলনা না পেলে কাঁদছে, ছোট কারণে মন খারাপ করছে, তখন বিরক্ত লাগত। পরে বুঝেছি, ছোট শিশুর কাছে তার অনুভূতিগুলো ছোট নয়, সেগুলোই তার বাস্তবতা।
এখন আমি চেষ্টা করি আগে তার অনুভূতিটা স্বীকার করতে।
যেমন—
“তোমার মন খারাপ হয়েছে?”
“তুমি রাগ করছো?”
গবেষণা বলছে, যখন শিশুর অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন তারা নিজেদের আবেগকে ভালোভাবে বুঝতে শেখে এবং শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
আর সহানুভূতির সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রথম ধাপই হলো পরিবারের সদস্যদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া।
আমাদের যৌথ পরিবারে বিষয়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এক বাসায় একাধিক প্রজন্ম থাকলে যোগাযোগও বেশি হয়, আবার ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাও থাকে।
আগে ছোটখাটো বিষয়ে আমি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতাম। এখন বুঝি, সহানুভূতি মানে শুধু দয়া করা নয়; বরং অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা।
যেমন, আমার বাবা অনেক সময় পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলেন। আগে আমি সঙ্গে সঙ্গে তর্ক করতাম। এখন চেষ্টা করি বুঝতে, উনারা যে সময় বড় হয়েছেন, সেই সময়ের বাস্তবতা আলাদা ছিল।
শিশুরাও যখন এই আচরণ দেখে, তখন তারা সম্মান ও বোঝাপড়া শিখে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাবা-মায়ের নিজেদের সম্পর্ক।
যদি শিশু দেখে—
• বাবা-মা একে অপরের কথা শোনে
• ভুল হলে ক্ষমা চায়
• কষ্টের সময় একে অপরের পাশে থাকে
তাহলে তার মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই সহানুভূতি গড়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন “মডেলিং আচরণ”— অর্থাৎ শিশুরা পর্যবেক্ষণ করেই সামাজিক আচরণ শেখে।
আমার ছেলে এখন মাঝে মাঝে তার বোন কাঁদলে বলে, “ওর মন খারাপ।” এগুলো হঠাৎ করে শেখেনি; পরিবারে দেখা আচরণ থেকেই ধীরে ধীরে শিখেছে।
সহানুভূতি শেখানোর জন্য দৈনন্দিন ছোট ছোট মুহূর্তও গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন—
• গল্প পড়ে চরিত্রের অনুভূতি নিয়ে কথা বলা
• কেউ সাহায্য করলে সেটি প্রশংসা করা
• প্রাণী বা অসহায় মানুষের অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করা
• “তুমি হলে কেমন অনুভব করতে?”— এমন প্রশ্ন করা
এসব আলোচনা শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষমতা বাড়ায়।
গবেষণা অনুযায়ী, সহানুভূতি বিকাশ হলে শিশুর
• সামাজিক দক্ষতা উন্নত হয়
• আগ্রাসী আচরণ কমে
• বন্ধুত্বের সম্পর্ক ভালো হয়
• আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ে
তবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, সহানুভূতি জোর করে শেখানো যায় না।
যদি বাসার পরিবেশ সবসময়—
• চিৎকার
• অপমান
• ভয়ভিত্তিক আচরণ
দিয়ে ভরা থাকে, তাহলে সহানুভূতি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে যায়।
কারণ শিশুরা নিরাপদ পরিবেশেই আবেগীয় শিক্ষা সবচেয়ে ভালোভাবে গ্রহণ করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের প্রতি সহানুভূতি।
আমাদের সমাজে অনেক বাবা-মা নিজেদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন না। আমিও আগে ভাবতাম ক্লান্তি বা চাপ নিয়ে কথা বলা দুর্বলতা। কিন্তু এখন বুঝি, নিজের অনুভূতি স্বাস্থ্যকরভাবে সামলাতে না পারলে অন্যের অনুভূতিও বোঝা কঠিন হয়ে যায়।
তাই এখন চেষ্টা করি—
• বাচ্চাদের সামনে সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করতে
• চাপ থাকলেও অযথা কঠোর না হতে
• ভুল হলে ক্ষমা চাইতে
কারণ সহানুভূতির সংস্কৃতি নিখুঁত মানুষ দিয়ে তৈরি হয় না; এটি তৈরি হয় সচেতন ছোট ছোট আচরণের মাধ্যমে।
আমি এখন বিশ্বাস করি, সন্তানকে শুধু ভালো ছাত্র বানানোই অভিভাবকত্বের লক্ষ্য নয়; তাকে একজন আবেগগতভাবে সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমার ছেলে হয়তো বড় হয়ে কোন খেলনা সবচেয়ে বেশি পেয়েছিল তা মনে রাখবে না। কিন্তু সে হয়তো মনে রাখবে  আমাদের বাসায় কারও কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, আর কেউ কষ্টে থাকলে পাশে দাঁড়ানো হতো।
আর সম্ভবত সেখান থেকেই সহানুভূতির শুরু।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000