
সত্যি বলতে, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে সহানুভূতি শেখে না। কারণ তাদের অনেক চাহিদাই আগে থেকেই পূরণ হয়ে যায়। তারা খুব কম পরিস্থিতিতে কষ্ট, সীমাবদ্ধতা বা বঞ্চনা কাছ থেকে দেখে। তাই সহানুভূতি শেখানোটা বাবা-মা হিসেবে আমাদের সচেতন দায়িত্ব। আমি ব্যক্তিগতভাবে...
প্রতিদিনের ব্যস্ত হসপিটাল রুটিনের মধ্যে মেয়ের ছোট ছোট বিষয়গুলো অনেক সময় খুব গভীরভাবে খেয়াল করা হয় না। সকালে তাড়াহুড়া, ডিউটি, ইমার্জেন্সি কল- সব মিলিয়ে দিনগুলো যেন খুব দ্রুত চলে যায়। এর মাঝেও একটা ব্যাপারে আমি সবসময় চেষ্টা করি, আমার মেয়েটার যেন কোনো অভাব না থাকে।
হয়তো এই কারণেই ওর প্রয়োজনের আগেই অনেক কিছু রেডি থাকে। নতুন বই, খেলনা, পছন্দের খাবার, প্রাইভেট ক্লাস - সবকিছুই কোনভাবে অ্যারেঞ্জ হয়ে যায়।
তবে কিছুদিন আগে খুব ছোট একটা ঘটনা ঘটে। তারপর বিষয়টা নিয়ে ভাবতে থাকি।
একদিন আমাদের বাসার হেল্পার অসুস্থ ছিল। আমি লক্ষ্য করলাম, আমার মেয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই বলছে, “ও কাজ করছে না কেন?” কথাটা ও না বুঝেই বলেছে, কিন্তু তখন হঠাৎ মনে হলো, আমরা কি ওকে শুধু সুবিধা দিতে দিতে অন্য মানুষের কষ্ট বা পরিশ্রম বোঝানোটা ভুলে যাচ্ছি?
সত্যি বলতে, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে সহানুভূতি শেখে না। কারণ তাদের অনেক চাহিদাই আগে থেকেই পূরণ হয়ে যায়। তারা খুব কম পরিস্থিতিতে কষ্ট, সীমাবদ্ধতা বা বঞ্চনা কাছ থেকে দেখে।
তাই সহানুভূতি শেখানোটা বাবা-মা হিসেবে আমাদের সচেতন দায়িত্ব। আমি ব্যক্তিগতভাবে বুঝেছি, সহানুভূতি শুধু উপদেশ দিয়ে শেখানো যায় না। এটা প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠে।
আগে আমি বাসার কর্মীদের সাথে মেয়ের সামনে খুব সাধারণভাবেই কথা বলতাম। এখন সচেতনভাবে সম্মানজনকভাবে কথা বলার চেষ্টা করি। কারণ শিশুরা আমাদের কথা কম, আচরণ বেশি লক্ষ্য করে।
আমার মেয়ে এখন যদি বাসার সহকারীকে “প্লিজ” বা “ধন্যবাদ” বলে কথা বলে, আমরা সেটা প্রশংসা করি। এটা ছোট বিষয় মনে হলেও, এগুলোই ধীরে ধীরে তার মধ্যে সম্মানবোধ তৈরি করে।
আরেকটা বিষয় আমি খুব সচেতনভাবে খেয়াল রাখি, তাকে সবসময় Center of The World মনে না হয়। অনেক বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুর মধ্যে অজান্তেই এক ধরনের অধিকারের মানসিকতা তৈরি হয়ে যায়। তারা ভাবতে শুরু করে, সবকিছু তাদের সুবিধামতোই চলবে। কিন্তু বাস্তব জীবন সবসময় এমন হয় না।
তাই আমি মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই মেয়েকে ছোট ছোট দায়িত্ব দিই। যেমন, নিজের খেলনা গুছিয়ে রাখা, পানির বোতল নিজে নিয়ে আসা, বা কারো জন্য অপেক্ষা করা। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো থেকেই অন্যের প্রতি বিবেচনাবোধ তৈরি হয়। আমরা বাবা-মা হিসেবে অনেক সময় সন্তানকে সব ধরনের অস্বস্তি বা কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ছোটখাটো হতাশা বা অপূর্ণতা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্যও উপকারী।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। শিশু যদি শুধু নিজের মতো একই জীবনধারার মানুষদের দেখেই বড় হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তার পৃথিবীটা খুব সীমিত হয়ে যায়। তাই আমি চেষ্টা করি, বয়স অনুযায়ী উপযুক্তভাবে তাকে বিভিন্ন ধরনের মানুষ ও জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে জানাতে।
তবে সহানুভূতি শেখানোর মানে এই না যে শিশুকে অপরাধবোধে ভোগাতে হবে। “তোমার সব আছে, তাই তোমার খারাপ লাগা উচিত” - এটা সঠিক শিক্ষা না। বরং তাকে বোঝানো দরকার যে, সব মানুষের জীবন একরকম নয়, আর সেই কারণেই অন্যের প্রতি দয়া ও মানবিকতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি সহানুভূতি শেখে মানসিক সংযোগ থেকে। যখন আমরা তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিই, ধৈর্য নিয়ে কথা শুনি, তখন তারাও ধীরে ধীরে অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখে।
আজকাল সামাজিক উপস্থাপন, পড়াশোনায় সাফল্য, আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা এসব নিয়ে আমরা বাবা-মা হিসেবে অনেক চিন্তা করি। কিন্তু সত্যি বলতে, সহানুভূতি থাকাটাও ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ শুধু পড়াশোনায় সফল কিন্তু মানসিকভাবে সংবেদনহীন একজন মানুষ হওয়ার চেয়ে, অনুভূতিশীল ও মানবিক একজন মানুষ হওয়া অনেক বেশি মূল্যবান।
সবশেষে এইটুকুই বলবো, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবেশে শিশু বড় করা শুধু তাকে ভালো সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়, তাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তোলার দায়িত্ব।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন