লোগো

মা কর্মজীবী হলে শিশুর মানসিক নিরাপত্তা কীভাবে বজায় রাখা যায়?

মা কর্মজীবী হলে শিশুর মানসিক নিরাপত্তা কীভাবে বজায় রাখা যায়?

ফাহমিদা বেগম প্রতিদিন সকালে খুব ভোরে গার্মেন্টসের উদ্দেশ্যে বের হন। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তিন বছরের ছোট ছেলেটা প্রায়ই কান্না শুরু করে দেয়। কখনো মায়ের কাপড় ধরে টানাটানি করে, কখনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমদিকে ফাহমিদা ভাবতেন, “এটা হয়তো শুধু আদর পাওয়ার জন্য।” কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, ছেলেটার ভেতরে এক ধরনের ভয় কাজ করছে “মা যদি আর ফিরে না আসে?”

এই অনুভূতিটাকেই শিশু মনোবিজ্ঞানে অনেক সময় emotional insecurity বা “মানসিক নিরাপত্তাহীনতা” বলা হয়। বিশেষ করে ২–৬ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এটা বেশি দেখা যায়। কারণ এই বয়সে শিশুর মস্তিষ্ক এখনও “সময়” বা “অনুপস্থিতি” পুরোপুরি বুঝতে শেখে না। তাই মা চোখের সামনে না থাকলে অনেক শিশুর মনে হয়, মা তাকে ছেড়ে চলে গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয় মূলত নিরবচ্ছিন্ন মানসিক সংযোগ থেকে। অর্থাৎ মা-বাবা সারাদিন পাশে থাকলেই যে শিশু মানসিক নিরাপত্তা বোধ করে এমন না। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুটি কি বিশ্বাস করতে পারছে যে তার প্রয়োজনের সময় কেউ তার পাশে থাকবে?
ফাহমিদার বড় মেয়েটা একদিন বলেছিল, “আম্মু কাজে গেলে ভাইয়া রাগ করে। কিন্তু রাতে তুমি ফিরলে আবার তোমার গায়েই ঘুমায়।” এটাই আসলে বড় ইঙ্গিত। শিশু রাগ দেখালেও সে মূলত মনোযোগ খুঁজছে।
অনেক কর্মজীবী মা অনুশোচনায় ভোগেন। মনে করেন, “আমি বাচ্চাকে সময় দিতে পারছি না, তাই ওর মানসিক সমস্যা হবে।” কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা বলছে, সন্তানের সাথে অল্প সময় হলেও যদি Quality interaction হয়, তাহলে সেটি শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য অনেক উপকারী হতে পারে।
ফাহমিদা পরে ছোট কিছু পরিবর্তন আনেন। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে তিনি ছেলেকে না বলে চুপচাপ চলে যাওয়া বন্ধ করেন। কারণ শিশুমনোবিজ্ঞানের মতে, হঠাৎ শিশুর ভরসার মানুষটি চলে গেলে তার উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। এখন তিনি বের হওয়ার আগে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “আম্মু কাজে যাচ্ছে। আবার দুপুরের পরে আসবে।” এবং তিনি ছেলেকে যে সময় ফিরে আসবেন বলে যান, ঠিক সেই সময়েই ফিরে আসেন। শুরুতে কান্না কমেনি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরে শিশুটি ধীরে ধীরে এই রুটিন বুঝতে শেখে এবং কান্নাও বন্ধ করে দেয়। 
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Predictable routine। শিশু যদি জানে কখন মা যাবে, কখন ফিরবে, তাহলে তার মস্তিষ্কে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। তাই ফাহমিদা এখন রাতে বাসায় ফিরে প্রতিদিন একইভাবে কিছু সময় শুধু সন্তানদের দেন। কখনো গল্প বলেন, কখনো পাশে বসে খেতে দেন, কখনো শুধু জড়িয়ে ধরে কথা বলেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই ছোট ছোট Repeated bonding moment শিশুর ব্রেন-এ নিরাপদ সম্পর্কের বন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করে।
তবে একটা ভুল অনেক পরিবারে দেখা যায়। শিশুর কান্না থামানোর জন্য সারাক্ষণ মোবাইল ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে সাময়িকভাবে শিশু চুপ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে আবেগ নিয়ন্ত্রণ দক্ষতা কমে যেতে পারে। কারণ তখন শিশু নিজের অনুভূতি সামলানো শেখার বদলে মনোযোগ বিচ্যুতি এর ওপর নির্ভর করতে শুরু করে।
সবশেষে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, কর্মজীবী মা হওয়া কোনো অপরাধ নয়। বরং সংগ্রাম করে পরিবার সামলানোও সন্তানের জন্য বড় একটি শিক্ষা। শিশু সবসময় মনে রাখে না, ‘মা কতক্ষণ পাশে ছিল’; অনেক সময় সে মনে রাখে, ‘মায়ের পাশে আমি নিরাপদ অনুভব করতাম কিনা।’ আর এই নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয় ছোট ছোট ভালোবাসা, নিয়মিত যোগাযোগ আর বিশ্বাস থেকে।
কারণ দিনের শেষে শিশুর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে ভালোবাসা আর ভরসা অনুভব করছে কিনা।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000