
একজন কর্মজীবী মা হিসেবে এই প্রশ্নটা আমি নিজের কাছেই অনেকবার করেছি। কারণ সত্যি বলতে, আমি আর আমার স্বামী দুজনেই ব্যস্ত পেশায় কাজ করি। এমন অনেক দিন যায়, যখন মেয়ের সঙ্গে পুরো দিন কাটানো তো দূরের কথা, ঠিকমতো বসে গল্প করার সময়ও খুব কম পাওয়া যায়। আর তখনই ভেতরে ভেতরে একটা চিন্তা কাজ করে, “আমি কি ওকে যথেষ্ট সময় দিতে পারছি?”
আমার মনে হয়, এই প্রশ্নটা প্রায় সব কর্মজীবী মা-বাবাই কোনো না কোনো সময় নিজেদের কাছে করেছেন।
আগে আমি ভাবতাম, সন্তানের সঙ্গে বেশি সময় কাটানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে বুঝেছি, শুধু একই বাসায় বা একই ঘরে অনেকক্ষণ থাকা মানেই গভীর সম্পর্ক তৈরি হওয়া না।
মনোবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, শিশুর সঙ্গে আবেগের বন্ধন অনেক বেশি নির্ভর করে সময়ের পরিমাণের চেয়ে সময়ের মানের ওপর। অর্থাৎ, আপনি সন্তানের সঙ্গে যে সময় কাটাচ্ছেন, সেই সময়টাতে আপনি কতটা মনোযোগী এবং মানসিকভাবে উপস্থিত আছেন, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমি নিজের জীবন থেকেই বিষয়টা বুঝেছি। আগে অনেক সময় বাসায় থেকেও মাথায় হাসপাতালের কাজ, ফোনকল বা ক্লান্তি ঘুরপাক খেত। মেয়ে গল্প করছে, কিন্তু আমি অর্ধেক শুনছি। পাশে থাকলেও মনটা অন্য কোথাও থাকত।
কিন্তু এখন আমি ছোট একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় পুরো মনোযোগ শুধু মেয়ের জন্য রাখি। তখন ফোন দূরে রাখি, অন্য কাজ করি না। ওর কথা শুনি, একসঙ্গে খেলি, বা শুধু গল্প করি।
খুব অল্প সময় হলেও আমি খেয়াল করেছি, এতে ও অনেক বেশি আপন অনুভব করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা, তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা, চোখে চোখ রেখে কথা বলা, এসব আচরণ শিশুর নিরাপত্তাবোধ এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে এর মানে এই না যে সময়ের পরিমাণের কোনো গুরুত্ব নেই।
শিশুদের জন্য নিয়মিত উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ছোট বয়সে তারা পরিচিত রুটিন ও নিয়মিত সঙ্গ থেকে নিরাপত্তা অনুভব করে। যদি বাবা-মা এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত সময়ই না কাটে, তাহলে সেটাও শিশুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই আমার মনে হয়, আসল বিষয়টা “সময় বেশি নাকি সময়ের মান ভালো”, এই তুলনা না। বরং দুটোর মধ্যে একটি সুন্দর ভারসাম্য খুঁজে নেওয়া।
কারণ সারাদিন পাশে থেকেও যদি কোনো অর্থবহ যোগাযোগ না হয়, তাহলে সম্পর্ক খুব গভীর হয় না। আবার সময় খুব কম হলে শিশুর সঙ্গে আবেগগত যোগাযোগও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
আমাদের মতো কর্মজীবী মা-বাবাদের জন্য হয়তো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হলো, অল্প সময় হলেও সেটাকে অর্থবহ করে তোলা।
যেমন—
• একসঙ্গে খাওয়া
• ঘুমানোর আগে গল্প করা
• স্কুলের ছোট ছোট ঘটনা মন দিয়ে শোনা
• প্রতিদিন কিছু নির্দিষ্ট পারিবারিক রুটিন রাখা
শিশুরা খোঁজে মনোযোগ, নিরাপত্তা আর আবেগের সংযোগ। তাই অনেক সময় দিনের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ের মাঝেও কয়েক মিনিটের আন্তরিক উপস্থিতি, কয়েক ঘণ্টার অন্যমনস্ক উপস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
একটা শিশু অনেক সময় expensive outing-এর চেয়ে বেশি মনে রাখে “মা মন দিয়ে তার আঁকা ছবিটা দেখেছিল বা বাবা ক্লান্ত থাকার পরও তার গল্প শুনেছিল”।
সবশেষে আমি যেটা বিশ্বাস করি, শিশুর সাথে কাটানো সময়ের দৈর্ঘ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সময়ের অনুভূতিটা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেষ পর্যন্ত শিশুরা মনে রাখে না আপনি কত ঘণ্টা পাশে ছিলেন। তারা বেশি মনে রাখে, পাশে থাকার সময় আপনি কতটা “সত্যি করে” তাদের সাথে ছিলেন।
💬 মন্তব্য (0)
মন্তব্য লিখুন