লোগো

শিক্ষাগত ডিগ্রি ছাড়াও কিভাবে শিশুকে সঠিক পথে গাইড করবেন?

শিক্ষাগত ডিগ্রি ছাড়াও কিভাবে শিশুকে সঠিক পথে গাইড করবেন?

শাহ আলমের নিজের পড়াশোনা খুব বেশি দূর পর্যন্ত হয়নি। ছোটবেলায় সংসারের টানাপোড়েনে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল। এখন রাস্তার পাশে বসে জুতা সেলাই করেই সংসার চলে। মাঝে মাঝে সে চুপচাপ ভাবে, “আমি নিজেই তো বেশি পড়ালেখা জানি না, তাহলে ছেলেকে ঠিকভাবে মানুষ করবো কিভাবে?” তার তিন বছরের ছেলে রাফি এখন কথা বলা, প্রশ্ন করা, নতুন জিনিস শেখার বয়সে। পাশের বাসার এক আন্টি একদিন বলেছিলেন, “বাচ্চাকে মানুষ করতে হলে তো অনেক শিক্ষিত হতে হয়।” কথাটা শাহ আলমের মনে গেঁথে গিয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন ভালো অভিভাবক বা গাইড হতে শুধু বড় একাডেমিক ডিগ্রী দরকার হয় না। শিশু মনোবিজ্ঞান ও বিকাশবিষয়ক গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, শিশুর মানসিক বিকাশে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে তার আশেপাশের মানুষের আচরণ, সময় দেয়া, নিরাপদ সম্পর্ক এবং শেখার পরিবেশ।
অর্থাৎ, বাবা-মা কতটা ভালোবাসা, ধৈর্য আর দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, সেটা অনেক সময় সার্টিফিকেটের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
শাহ আলম হয়তো ইংরেজি বই পড়ে শোনাতে পারে না, কিন্তু সে রাফিকে নিয়ে প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটতে বের হলে গাছ দেখিয়ে বলে, “এটা আমগাছ”, “ওটা কাক”, “এইটা বাস”, এই সাধারণ কথোপকথনও শিশুর ভাষা শেখা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট শিশুর সাথে নিয়মিত কথা বলা তার মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এমনকি দরিদ্র পরিবারের শিশুরাও অনেক ভালো বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা তৈরি করতে পারে, যদি তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও ইতিবাচক কথাবার্তা হয়।
অনেক বাবা-মা ভাবেন, “আমি তো পড়ালেখা জানি না, পড়াবো কী?” কিন্তু গাইড হওয়া মানে সব প্রশ্নের উত্তর জানা না। বরং শিশুকে শেখার আগ্রহ তৈরি করে দেয়া।
যেমন, রাফি যখন জিজ্ঞেস করে “আকাশ নীল কেন?”, তখন শাহ আলম উত্তর না জানলেও বলে, “চলো খুঁজে দেখি” বা “স্কুলে স্যারকে জিজ্ঞেস করবা।” এতে শিশু বুঝতে শেখে যে প্রশ্ন করা ভালো, আর শেখা একটা চলমান ব্যাপার।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, কৌতূহলী মানসিকতা তৈরি হওয়া শিশুর শেখার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি। এছাড়া শিশুর সামনে বাবা-মায়ের আচরণও বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। শাহ আলম যখন কষ্টের মধ্যেও মানুষের সাথে ভদ্রভাবে কথা বলে, কথা রাখার চেষ্টা করে, মিথ্যা না বলতে শেখায়,  তখন রাফি সেগুলোই শিখছে।
শিশুরা শুধু কথা শুনে শেখে না, তারা দেখে দেখে শেখে। বিজ্ঞানীরা একে অবজারভেশনাল লার্নিং (Observational Learning) বলেন। অর্থাৎ, বড়দের আচরণ শিশুর মস্তিষ্কে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
অনেক সময় কম শিক্ষিত বাবা-মায়েরা সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করিয়েই ভাবেন দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাস্তবে শিশুর পাশে বসে তার দিনের গল্প শোনা, স্কুলে কী শিখলো জিজ্ঞেস করা, ভালো কাজের প্রশংসা করা, এগুলোও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শাহ আলম এখন রাতে বাসায় ফিরে রাফিকে জিজ্ঞেস করে, “আজ কী খেললা?” “কী শিখলা?” এতে রাফি আনন্দ নিয়ে কথা বলে। এই ছোট ছোট আলাপ শিশুর মানসিক বন্ধন ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুকে সবসময় ভয় দেখিয়ে শেখানো ঠিক না। “পড়বি না তো রিকশা চালাতে হবে”, এই ধরনের কথা শিশুর মনে ভয় ও লজ্জা তৈরি করতে পারে। এতে তার আত্মসম্মান ও শেখার আগ্রহ কমে যেতে পারে। বরং তাকে ইতিবাচকভাবে বোঝানো উচিত “পড়াশোনা করলে তুমি বড় হয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জন্য ভালো কিছু করার সুযোগ পাবে”। 
গবেষণায় দেখা গেছে, সাপোর্টিভ প্যারেন্টিং শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষাগত আগ্রহ, দুটোই বাড়াতে সাহায্য করে।
শাহ আলম এখন বুঝেছে, বড় ডিগ্রি না থাকলেও একজন বাবা সন্তানের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হতে পারে।
কারণ শিশুর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,
কে তাকে মন দিয়ে শুনছে,
কে তার পাশে দাঁড়াচ্ছে,
আর কে তাকে বিশ্বাস করতে শেখাচ্ছে যে “তুমিও পারবে।”
ভালো গাইড হওয়া মানে সব জানা মানুষ হওয়া না। ভালো গাইড হওয়া মানে শেখার পথটায় সন্তানের পাশে থাকা।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন:

FacebookTwitterWhatsAppTelegramLinkedIn

💬 মন্তব্য (0)

মন্তব্য লোড হচ্ছে...

মন্তব্য লিখুন

0/1000